Euthanasia – latest

নিষ্কৃতি-মৃত্যু বা স্বেচ্ছামৃত্যু নিয়ে শেষ পর্য্যন্ত তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়ালো?
সুমিত্রা পদ্মনাভন

অরুণা শানবাগ এর ঘটনাটা বোধহয় সকলের ই জানা। ৩৭ বছর আধা-কোমায় থাকার পর এই জীবন্মৃত অবস্থা থেকে তাকে রেহাই দেওয়া – অর্থাৎ তাকে নিষ্কৃতি-মৃত্যু উপহার দেওয়া মানবিক না অমানবিক? নৈতিক না অনৈতিক? — এই নিয়ে আবার নতুন করে ভাবনা চিন্তা করতে বাধ্য হলাম আমরা সবাই। পিঙ্কি ভিরানি নামে অরুণার এক শুভাকাঙ্খী সাংবাদিক তাকে নিষ্কৃতি-মৃত্যু দেওয়ার জন্যে আদালতে আবেদন করে।

আবেদন খারিজ হয়ে যায়। কারণ – ১)অরুণা কে কোনো যন্ত্রপাতি Ventilator ইত্যাদি দিয়ে কৃত্রিম ভাবে বাঁচিয়ে রাখা হয়নি, সে খেতে পারছিল, তাকে খাইয়ে দিতে হত অবশ্য। ২) আবেদনকারী অরুণার নিকট আত্মীয় নন। তার সবচেয়ে কাছের মানুষ হাসপাতাল কর্মীরা, যারা নিশ্চিতভাবে বাঁচিয়ে রাখার পক্ষে। তাকে মারতে হলে চিরঘুমের ইঞ্জেকশান দিয়ে বা না খেতে দিয়ে মেরে ফেলতে হত। আইন সেটা অনুমোদন করেনি।

কিন্তু আমরা যারা স্বেচ্ছামৃত্যু আইনী করা নিয়ে সওয়াল করছিলাম, তারা কী পেলাম? দেখলাম সারা দেশ জুড়ে এই বিষয়টা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা, বিতর্ক, তোলপাড় চললো ক’দিন – বিভিন্ন মতামত উঠে এল। তারমধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল—

৭ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পরই কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী বীরাপ্পা মইলি বললেন– “নিষ্কৃতি-মৃত্যু নিয়ে সুস্পষ্ট আইন প্রণয়নের প্রয়োজন আছে। বাঁচার মতো মৃত্যুরও অধিকার মানুষের থাকা উচিত কি না, তা নিয়ে সংসদে বিতর্ক হওয়া দরকার”। আমরা এতে খুশি। হল্যান্ডের মত কিছু দেশে নিজের ইচ্ছায় মৃত্যুবরণ করার অধিকার আইনসম্মত। আমরা এখনও এতটা ভাবতে পারছিনা। এখানে নিষ্কৃতি-মৃত্যু ঠিক কী সেটাই সবার কাছে পরিষ্কার নয়।

রোগীর ইচ্ছা-অনিচ্ছা প্রকাশের কোন উপায় যখন নেই – তখনই নিষ্কৃতি-মৃত্যুর প্রশ্ন ওঠে। এটাই euthanasia বা Mercy-killing। এটা আবার দুই প্রকার। active ও passive– প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ। প্রথম টা হচ্ছে ইঞ্জেকশান দিয়ে চিরনিদ্রায় পাঠিয়ে দেওয়া—রোগীর সেরে ওঠার সম্ভাবনা যখন নেই, রোগী যখন যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছে, তখন নিকট আত্মীয়রা এই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। সেখানে ডাক্তার, মনস্তত্ববিদ ও আইনজীবী থাকেন সহযোগিতা করতে। আর দ্বিতীয়, অর্থাৎ পরোক্ষ নিষ্কৃতি-মৃত্যু ঘটতে দেওয়া হচ্ছে –যখন রোগীর বাঁচার কোন সম্ভাবনা তো নেই ই, বরং তাকে কৃত্রিম উপায়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। অক্সিজেন, ভেন্টিলেটর, রেস্পিরেটার ইত্যাদি যন্ত্রপাতি ও অত্যন্ত দামী কিছু জীবনদায়ী ওষুধ দিয়ে শরীরটাকে যান্ত্রিকভাবে (technically) বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে। পরোক্ষ নিষ্কৃতি-মৃত্যু ঘটবে এইসব যান্ত্রিক ব্যবস্থাগুলো তুলে নেওয়ামাত্র। মৃত্যু ত্বরান্বিত হবে, অযথা খরচ করে হাসপাতালের বিছানা আটকে রাখা হবে না। এখন আদালতের রায়ে (৭-৩-১১)একথা বলা হয়েছে যে আইন আসতে চলেছে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের তত্বাবধানে পরোক্ষ নিষ্কৃতি-মৃত্যু ঘটানোর পক্ষে। এবং যতদিন আইনটি পাশ না হচ্ছে, ততদিন এই ভাবে নিকটাত্মীয়দের ইচ্ছায় passive euthanasia দেওয়া যেতে পারে উচ্চ আদালতের অনুমতি নিয়ে। বাহ, তবু তো অনেকটা এগনো গেল। আরেকটা ইতিবাচক কথাও রায়টিতে আছে—এখন আর আত্মহত্যার চেষ্টা শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়। (এতদিন ৩০৯ ধারায় তা শাস্তিযোগ্য ছিল) “যে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে, তার শাস্তি নয়, সহায়তা দরকার” –একথা স্বীকার করেছে আদালত।

৭ মার্চের রায় তাই ঐতিহাসিক, এবং নিঃসন্দেহে আমাদের ও আরো অনেকের দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফল।

***

তবে চুপিচুপি একটা কথা বলি। পরোক্ষ নিষ্কৃতি-মৃত্যু আমাদের দেশে আগেও ছিল, আগেও হত, এখনো হয়। রোগীর আত্মীয় পরিজন যদি ICCU বা ভেন্টিলেটারের খরচ না বহন করতে পারেন, তাহলে কি নার্সিং-হোম এমনি এমনি রোগী কে বাঁচিয়ে রাখে? না। বন্ড সই করিয়ে নিয়ে ছেড়ে দেয়, বা যন্ত্রপাতি খুলে নেয়। আর রাস্তার ধারে পড়ে থাকা যেসব গৃহহীন, অসুস্থ, পরিত্যক্ত মানুষ তিল তিল করে মারা যান, তারাও তো স্বেচ্ছামৃত্যুই বরণ করেন—আদালত এর অনুমতি ছাড়াই। তাই বলছিলাম খুব নতুন কিছু ঘটেনি। শুধু আদালত ভণিতা না করে সত্যিটা স্বীকার করে নিয়েছে। এটাই বা কম কী? আর আত্মহত্যা শাস্তিযোগ্য হলে তো আমলাশোল আর বিদর্ভের মানুষগুলো জেল ভরিয়ে দেবে দুদিনে, জেলে বসে দু-বেলা খাবে; বেঁচে যাবে।

তাই এখন আইনী পথে না গিয়ে প্রিয়জনের মৃত্যুর ব্যাপারটা ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা সামাজিক স্তরে চিন্তা করাই ভাল। হয়তো আইন টা আছে জেনে সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে অনেকের। অনৈতিক কিছু করছিনা, অমানবিক তো নয় ই –এই ভাবনাটা আমাদের সাহায্য করবে। আর যারা ভাবেন অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে আত্মা শান্তি পাবেনা, স্বেচ্ছামৃত্যু অস্বাভাবিক, অপঘাত ইত্যাদি তাদের বলি – প্রথমত আত্মা নেই, থাকেনা কোথাও মৃত্যুর পর। দ্বিতীয়ত, যান্ত্রিকভাবে বাঁচিয়ে রাখা আরো অস্বাভাবিক। যতক্ষণ সারিয়ে তোলা সম্ভব ততক্ষণ ই চিকিতসার মূল্য। মৃত্যু প্রকৃতির নিয়ম, মৃত্যু স্বাভাবিক। শুধু শুধু মানসিক, শারীরিক, আর্থিক কষ্ট সহ্য করে একজন কে যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকতে বাধ্য করার মধ্যে কোন মহত্ব নেই।

***

পিঙ্কি ভিরানি ও আদালত কে ধন্যবাদ বিষয়টাকে নতুন করে তুলে ধরার জন্যে।অনেকটা এগোন গেছে। তবে সত্যি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে তখনই যখন ভেঙ্কটেশ দের আবেদন মেনে নেওয়া হবে। হায়দ্রাবাদের দাবা খেলোয়াড় ভেঙ্কটেশ কুড়ি বছর বয়সে দুরারোগ্য ও যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু থেকে নিস্তার চেয়েছিল ২০০৪ সালে; চেয়েছিল নিজের দেহ দান করতে। অনুমতি পায়নি। তিন দিনের মধ্যে তার মৃত্যু হয়েছিল। চোখ ছাড়া আর কোনো দেহাংশ কাজে লাগেনি, ওর শেষ ইচ্ছা পূর্ণ হয়নি।

তাই আমরা অপেক্ষা করে রইলাম সেই দিনটির জন্যে যখন নিজের জীবন-এর মত নিজ়ের মৃত্যুর ওপরও আমাদের পূর্ণ অধিকার থাকবে।

থাকবে নিজের দেহ দান করার অধিকার, অযথা হাসপাতালের দুর্লভ শয্যা দখল করে না রেখে, ছেড়ে দেওয়ার অধিকার।

Share

Leave a Reply

 

 

 

You can use these HTML tags

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>