হিউম্যানিস্টস অ্যাসোসিয়েশন –এর কেন্দ্রীয় কমিটির বার্ষিক সম্মেলনে পেশ করা সম্পাদকীয় প্রতিবেদন

হিউম্যানিস্টস অ্যাসোসিয়েশন

রেজি নং – S / 1L / 22901

রেজিস্টার্ড অফিসঃ- পি-২, ব্লক-বি, কলকাতা- ৭০০০৮৯

সম্পাদকীয় প্রতিবেদন

বার্ষিক সম্মেলনঃ- ২০১৪

স্থানঃ-পি অ্যান্ড টি কমিউনিটি হল,  যশোর রোড, দমদম

১ মার্চ, ২০১৪

————————————————————————————————————————-

২১ বছরে পা দিল হিউম্যানিস্টস অ্যাসোসিয়েশন। বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমাদের বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সম্ভবত এই সপ্তাহের মধ্যে ঘোষণা হতে চলেছে লোক সভা ভোট। দেশের সরকার গড়ার নির্বাচন। একদিকে সাম্প্রদায়িক শক্তির আস্ফালন এবার সরকার তাঁরাই গড়বে। স্পন্সর করছেন বিভিন্ন শিল্পপতি। আর একদিকে চড়া দ্রব্যমূল্যের অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে নানা দুর্নীতিতে ডুবে থাকা কংগ্রেসও নানা ভাবে পাশ করার চেষ্টা করছে। যুবরাজ বনাম চা বিক্রেতা(?)-র লড়াই মানুষ বেশ খাচ্ছে। মানুষ ভুলে গেছেন অথবা ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিজেপি সরকারও নানা দুর্নীতিতে জড়িয়ে গিয়েছিল। এসবের  মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক দলগুলি। কে কার হাত ধরবে, তা নিয়ে চলছে নানা সমীকরণ। এই সুযোগে নানা ধরণের ফায়দা লুটতে আঞ্চলিক ও ছোট দলগুলি হিসেব কষা শুরু করেছে। অনেকেই প্রধান মন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।

সরকারের নীতি নির্ধারণকারি মানুষগুলি পালটায় কিন্তু, স্বাধীনতার ৬৬ বছর পরেও মানুষ তাঁর মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে পারেন না। আন্না হাজারের সমস্ত বিষয়গুলির সঙ্গে আমরা সহমত না হতে পারলেও তাঁর বেশ কিছু সিদ্ধান্ত ভারতের অসংখ্য মানুষকে যে ভাবে নাড়া দিয়েছিল, তাতে আমরা কিছুটা আশার আলো দেখছিলাম। কিন্তু, সেই আন্না মমতা-র হয়ে ভোটের প্রচারে নামার ঘোষণা করায় আমরা শঙ্কিত। আমরা দেখলাম আম আদমি পার্টি-কে। কেজরিয়ালের সাইবার বাহিনী দেখিয়ে দিল মানুষ চায় স্বচ্ছ প্রশাসন। নানা বাঁধা বিপত্তির মধ্যেও দিল্লী বিধানসভার  ২৮  টি আসন দখল করে নিয়েছে নতুন রাজনৈতিক দল আম আদমি পার্টি। ম্যাজিক সংখ্যা না পাওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, শিল্পপতি কার্যত জোর করে সরকার গঠন করতে বাধ্য করল আম আদমি পার্টিকে। আম আদমি পার্টি এগালেও সমালোচনা, পিছালেও সমালোচনা, কংগ্রেসের সঙ্গে গেলেও সমালোচনা, বিজেপির সঙ্গে গেলেও সমালোচনা। সম্পূর্ণ ভাবে ফাঁদে ফেলা হল আম আদমি পার্টিকে। ফাঁদে ফেলার সহযোগিতায় এগিয়ে এল প্রচার মাধ্যমের একটা বড় অংশও। ফাঁদে পরে সরকার গঠনের পরও চলল কাদের সমর্থনে সরকার এই নিয়ে আবার সমালোচনা। সমালোচনা সত্ত্বেও জনহিতকর কাজ  শুরু করা মাত্রই শিল্পপতি-রাজনৈতিক নেতা-আমলাদের নানা ভাবে স্বার্থে আঘাত পরল। ব্যাশ, প্রক্রিয়া শুরু হল সরকার ফেলার। সহযোগিতায় এবারও প্রচার মাধ্যমের একাংশ। কেজিরিওয়াল-কে সরকার ছেড়ে দিতে হল। নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ না থাকা  আম আদমি পার্টি-র সমস্ত নীতি-আদর্শ-র সাথে আমরা একমত না হতে পারলেও আমরা দেখলাম তুলনা মূলক ভাবে স্বচ্ছ একটি দলকে কিভাবে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এবার দেখা যাক পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা। দীর্ঘ বছর সিপিআই(এম) -এর সন্ত্রাসে অতিষ্ঠ মানুষ ২০১১ সালে সিপিএম-কে ছুঁড়ে ফেলে তৃণমূল কংগ্রেসকে কাছে টেনে নিয়েছেন। কিন্তু কিছু দিন যেতেই ‘রাজা’ স্বমহিমায়। কিছু ভাল কাজ হচ্ছে। কিন্তু খারাপ কাজও হচ্ছে পাল্লা দিয়ে। সিপিআই(এম)-এর ‘হার্মাদ’ নামে চিহ্নিত ব্যক্তিরাই এখন দলে দলে নাম লেখাচ্ছে তৃণমূলের ‘জল্লাদ’ বাহিনীতে। ধর্ষণ সহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা বেড়ে চলেছে। কিন্তু, সরকার কোনও সমালোচনা শুনতে নারাজ। সমালোচনা করলেই, সে হয় মাওবাদী না হয় সিপিএম। নিন্দুকেরা বলেন সরকার পাল্টাতে এই মাওবাদীদেরও নাকি ভূমিকা রয়েছে, তৃণমূলের এক অংশের সঙ্গে নাকি আঁতাতও ছিল ঐ নিষিদ্ধ সংগঠনের। অবশ্য এই ‘দেগে’ দেওয়ার ব্যাপারটা বাম আমলেও ছিল। তখন প্রতিবাদ অথবা সরকার বিরোধী কথা বললেই তাকে বলা হত তৃণমূল অথবা নকশাল অথবা মাওবাদী। তাই বাম সরকারের আমলে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম সহ সব আন্দোলনেই সরকার ‘মাও’ দেখত। এখন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে সারের দাম বৃদ্ধি করা নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি মাওবাদী। যেমন ভাবে শিলাদিত্য চৌধুরীকে মাওবাদী বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। কামদুনিতে ছাত্রী ধর্ষণ করে খুনের ঘটনার পর নিজেদের গ্রামে মুখ্যমন্ত্রীকে পেয়ে গ্রাম্য ঢঙে ‘দিদিকে’ কিছু বলতে গিয়ে মৌসুমি কয়াল ও  টুম্পা কয়াল সিপিএম হয়ে যায়, হয়ে যায় মাওবাদী। আবার এই ঘটনাই আমাদের শেখাল সাধারণ ঘড় সংসার করা আপাত নিরীহ মহিলারা কী ভাবে প্রতিবাদী চরিত্র হয়ে উঠতে পারে। গোটা গ্রাম সংগঠিত ভাবে আন্দোলন শুরু করে। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অসম লড়াই। সেই লড়াইয়ের কারণে কামদুনি কিছুটা হলেও ফল পেয়েছে।

আমরা দেখেছি দিল্লীতে ছাত্রী ধর্ষণের পর দিল্লীতে গণ আন্দোলন। আন্দোলন ছড়িয়ে পরে গোটা দেশে। আন্দোলনে চাপে পরে সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হয়। কিন্তু, পশ্চিমবঙ্গে ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে কোনও প্রতিবাদ করা চলবে না। যা বলার বলবেন মুখ্যমন্ত্রী। কামদুনির ঘটনার প্রতিবাদে  ২ অক্টোবর,২০১৩  আমরা  একটা মৌন মিছিল শুরু করলে মাঝ পথেই আমাদের আটকে দেয় পুলিশ। হ্যাঁ, বাম সরকারের আমলেও ধর্ষণের ঘটনা ঘটত এই সত্যটির সঙ্গে আমরা এক মত হয়েই বলছি, যে সময়েই হোকনা কেন ধর্ষণ নিন্দনীয়, ঘৃণার যোগ্য এবং শাস্তি যোগ্য কাজ। কোনও ভাবেই এই কাজে যুক্তদের আড়াল করা অথবা এমন কোনও বক্তব্য বলা উচিত নয় যাতে ধর্ষক-রা  উৎসাহিত হয়।  মানুষের চিন্তা-ভাবনা গুলিয়ে দিতে এক শ্রেণীর ব্যক্তি অথবা সংগঠন এবং প্রচার মাধ্যমের একটা অংশ সব সময় সক্রিয়। তাই আমরা ধর্ষণের ঘটানার কারণ হিসাবে জানতে পারি, “মেয়েদের পোষাক”(?)। আমরা পশ্চিমবঙ্গে শেষ এক বছরে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনা গুলির দিকে তাকালে কী আমরা সেই কারণটাই দেখতে পাই? মোটেও না। যেখানে অনেক গুলি ঘটনাই ঘটেছে ৩ থেকে ৫ বছরের শিশু কন্যার সঙ্গে। ঘটেছে গ্রামের গোড়ালি থেকে গলা পর্যন্ত ঢাকা পোষাক পরা মহিলাদের সঙ্গে। এই ঘটনা বন্ধ করতে দরকার রাজনৈতিক দল অথবা রাজনৈতিক স্বার্থের কথা চিন্তা না করে দ্রুত ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করিয়ে দোষীকে কঠোর শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করা। দরকার চিন্তার পরিবর্তন, সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। এই বিষয়ে একটি দিশা দেওয়া হয়েছিল ২০১৩ সালের বার্ষিক সম্মেলনের সম্পাদকীয় প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনের একটি অংশ ছিল বর্তমানে মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে বেশ চাঞ্চল্যকর আলোচনা চিন্তাভাবনা করা হচ্ছেচারিদিকে দেখতে শুনতে পাচ্ছি অনেক কথা অবাক করার মত আগের চেয়ে মেয়েরা বাইরে বেরোচ্ছে বেশিপড়া বা চাকরির কারণে অনেক অ্যাডভেঞ্চার প্রবণও হয়ে উঠছে আজকের কিশোরী-তরুণীরা তাই তাদের কিছুটা ঝুঁকি থেকেই যায় বাড়ির বড়রা সাহায্য করবেন, যেকোনও বিপদে সাপোর্ট করবেনএটাই কাম্য কিন্তু তার সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে এক্ষেত্রে ইস্যুটা সামাজিক ন্যায়-অন্যায় এর বিষয়; নারী বনাম পুরুষের রেষারেষি নয় উগ্রস্বভাব, পুরুষবিদ্বেষী মেয়েরা এখানে বিপদটাকে বাড়িয়ে তুলবেন না বরং লিঙ্গ-নির্বিশেষে নারী-পুরুষে, মানুষে-মানুষে বন্ধুত্বের সম্পর্ককে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে কারাটে , কুংফু শিখে, নানচাকু নিয়ে আত্মরক্ষার প্রয়োজন হবেনা, যদি এই বন্ধুত্বের সম্পর্ককে প্রাধান্য দেওয়া যায়

তার জন্যে আমাদের প্রাথমিক সাজেশন সমস্ত স্কুল-কলেজকে কো-এডুকেশান করার দাবি জানানো এটা নিয়ে ডিবেট হতে পারে, প্রশ্ন উঠে আসতে পারে-আসুক আমরা তৈরী থাকবো উত্তর দেওয়ার জন্যে আমাদের দাবি আমরা যারা একসঙ্গে কাজ করছি, আমরা যেন আমাদের ছেলে-মেয়েদের কো-এডুকেশান স্কুলে পড়াতে প্রস্তুত থাকি ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে বড় হলে ১০-১২-১৪ বছরে তারা পরস্পরকে আগে মানুষ বলে চিনবে, তার পরে তো নারী বা পুরুষ হয়ে উঠবে বিষয়ে বিতর্ক হোক, চাই যদি কেউ ভিন্ন মত পোষণ করেন -বলুন

এবারে হিউম্যানিস্টস অ্যাসোসিয়েশন -এর এজেন্ডায় যুক্ত হল এই বিষয়টা নারী-পুরুষের সামাজিক ভেদাভেদ দূর করার লক্ষ্যে সবরকম চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া

পাশাপাশি নিজেরা খোলামনে চিন্তা করুন। অন্যের পরিকল্পিত (কু)চিন্তার শিকার হবেন না। যেমন ঘটেছিল, ২০০৪ সালে। ধনঞ্জয়ের ফাঁসির সময়। ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় দোষী প্রমাণিত হওয়ায় ধনঞ্জয়ের ফাঁসির নির্দেশ হওয়ার পর প্রচারমাধ্যম-কিছু সংগঠন এবং এক শ্রেণীর মানুষের উদ্দেশ্য মূলক ভাবে প্রচার করা ‘চিন্তা’-য় প্রভাবিত হয়ে চরম ভাবে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা-বিরোধী পুরুষ এবং মহিলাদের দেখেছি ধনঞ্জয়ের কথা ভেবে খাওয়া-ঘুম ভুলে গেছেন। এমনকি ধনঞ্জয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে অনেকেই চোখের জলও ফেলেছেন। এদের অনেকেই অন্য সময় বলে থাকেন ধর্ষকদের পিটিয়ে মেরে ফেলা উচিত। আদালতে ফাঁসির সাজা ঘোষণার পর রাষ্ট্রপতি-র কাছে প্রাণ ভিক্ষা করেছিল ধনঞ্জয়। পরিকল্পনা মাফিক একটা শ্রেণী ফাঁসির সাজা রাষ্ট্রপতি যাতে রদ করে দেন সেই উদ্ধেশ্যে গোটা দেশে ধনঞ্জয়ের পক্ষে ভাবাবেগ তৈরি করেছিল। পালটা আমরাও পথে নেমেছিলাম। আমাদের বক্তব্য ছিল, আমাদের দেশের সর্বচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড। বিরলের মধ্যে বিরলতম ঘটনায় এই সাজা দেওয়া হয়। ধনঞ্জয়ের ঘটনা বিচারক বিরলের মধ্যে বিরলতম মনে করে মৃত্যুদণ্ড দেন। সেই সাজা কোনও কারণে রাষ্ট্রপতি-র পরিবর্তন করে দেওয়া উচিত নয়। সর্বচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড থাকবে কিনা সেটা নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। কিন্তু, যেখানে মৃত্যুদণ্ডের কথা বলা রয়েছে, সেখানে রাষ্ট্রপতি সেই সাজা রদ করে দিলে অপরাধীদের অপরাধ করার বিষয়ে উৎসাহিত করবে। সর্বচ্চ সাজা যাতে রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন না করেন সেই দাবি নিয়ে আমরা স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছিলাম, পথসভা করেছিলাম, মানুষদের বুঝিয়ে ছিলাম।

বর্তমান রাজ্য সরকার মেয়েদের জন্য একটি প্রকল্প এনেছে। নাম ‘কণ্যাশ্রী’। ভাল উদ্যোগ। মেয়েদের যাতে ১৮ বছরের আগে বিয়ে না হয়, পাশাপাশি কোনও বাড়িতে কন্যা সন্তান জন্ম নিলে তাঁকে ‘বোঝা’ না ভাবা হয় সেই উদ্দেশ্যে করা এই প্রকল্পর প্রশংসা করেও বলতে হয় শুধু অর্থ দিয়ে এই সামাজিক ব্যাধি দূর করা যাবেনা। অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে-সঙ্গে চাই সামাজিক পরিবর্তনও। চাই চিন্তার পরিবর্তন। লিঙ্গ ভিত্তিক সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দেওয়া এই প্রকল্প ‘লিঙ্গ ভেদ’ প্রথা টিকিয়ে রাখার সহায়ক হিসাবে ব্যবহার হবে না তো? ছাত্র-কিশোর-যুবক-দের মধ্যে এর কোনও প্রভাব পরবেনাতো সেটাও ভেবে দেখা দরকার।

আবার ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতির অংশ হিসাবে ‘ইমাম’-দের তোষণ চলছে। সেই বিষয়েও জনমত তৈরি করা প্রয়োজন।

কিছুক্ষেত্রে ধর্ষণ অথবা শ্লীলতাহানি-কে অসৎভাবে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহারের অভিযোগও উঠছে। কিন্তু সেগুলি বিচারের বিষয়। সঠিক তদন্ত ও বিচারের আগে বলা সম্ভব নয় অভিযোগ সত্য না মিথ্যা। কিন্তু রাজ্য মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানকে যেভাবে সরে যেতে হল তা কিন্তু আমাদের কাছে চিন্তার বিষয়। রাজ্য সরকার সহ কোনও ব্যক্তি অথবা প্রতিষ্ঠান মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটালেই প্রাক্তন চেয়ারম্যান অশোক গঙ্গোপাধ্যায় কমিশনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছিলেন অথবা সুপারিশ করছিলেন। যা অনেক সময় রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে যাচ্ছিল। বারবার বিব্রত হতে হচ্ছিল সরকারকে। সরকার কোনও সুপারিশ-ই মানছিল না।  এর পর একটি ব্লগে নাম না করে অশোক বাবুর বিরুদ্ধে লেখা শ্লীলতাহানির অভিযোগ সমস্ত কিছু পাল্টে দিল। ঘটনাটি সত্য না মিথ্যা আমাদের জানা নেই। কিন্তু আমরা দেখলাম, অশোক বাবুকে চেয়ার থেকে সরাতে সরকারের তৎপরতা। চার দিকের চাপে পরে কাজ করতে না পারা অশোক বাবু নিজেই পদত্যাগ করেন। কিন্তু পদত্যাগের এতদিন পরও কেন ঐ মহিলা থানায় অথবা আদালতে মামলা করলেন না? এই বিষয়টিও আমাদের ভাবিয়ে তুলছে।

ভারতীয় দণ্ডবিধির ধারা ৩৭৭ অনুযায়ী গত ১১-ই ডিসেম্বর, ২০১৩ ভারতের শীর্ষ আদালত জানালো, সমকামিতা বা সম-লিঙ্গ প্রেম অসাংবিধানিক ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।  দেশের ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার একটা বিরাট অংশ সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে হাহাকার করে উঠলো। এই আস্ফালনে সামিল করা হলো, বলিউড থেকে টলিউডের বিভিন্ন সেলেব্রিটিদের। দুর্নীতিতে ডুবে থাকা কেন্দ্রীয় সরকারের ‘মহামাতা’ শ্রীমতী সনিয়া এবং তাঁর আস্তাবলের দুই ‘নন্দী-ভৃঙ্গী’ জানালেন যে সরকার এই রায়ের বিপক্ষে, কারণ, এটা নাকি ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারে হস্তক্ষেপ! ভারতে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী সমস্ত আইনের পক্ষে চিকন গলা তোলা এই সব সন্ত্রাসবাদের বাবা-মায়েরা উতলা হচ্ছেন স্বাধীনতা, গণতন্ত্র নিয়ে! সমকামিতার পক্ষ নিয়ে বক্তব্য রাখছেন কিছু রাজনৈতিক দল, কারণ, শেষমেশ ‘সমকামী’ রাও তো তাদের কাছে এক ‘ভোট-ব্যাঙ্ক’।  এই বিষয়ে আমরাও বহু প্রশ্নের সম্মুখীন। কারণ, আমাদের অবস্থান এই তৈরি করা হুজুগের বিরুদ্ধে। হ্যাঁ,  তাই দ্বিধাহীন ভাবে কোর্টের এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছি। অনেকেই আমাদের এই অবস্থানে ক্ষুব্ধ হয়েছেন, বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, এই হঠাৎ গজিয়ে ওঠা হুজুগের স্রোত-এর উল্টোদিকে সাঁতার কাটতে দেখে।  বিভিন্ন গণমাধমের খবর পড়ে-শুনে মনে হচ্ছে, ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা কে যারা ধিক্কার জানাচ্ছেন, তাদের প্রতিবাদের মুল সুর হলো যে এটা কোনও ব্যক্তির নিজের পছন্দ মতো যৌন-সঙ্গী বেছে নেবার ‘মৌলিক অধিকার’-কে লঙ্ঘন করে। অর্থাৎ কিনা, এই রায় যৌন-স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ।  ভারতীয় সংবিধানের তৃতীয় খণ্ডে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার গুলো লেখা আছে। এই অধিকার গুলোকে ৬ ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে, যেমন :- ১। সাম্যের অধিকার, ২। স্বাধীনতার অধিকার, ৩। শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার, ৪। ধর্মীয় অধিকার, ৫। সংস্কৃতি ও শিক্ষা বিষয়ক অধিকার, ৬। শাসন-তান্ত্রিক প্রতিবিধানের অধিকার।

সুতরাং, ‘যৌন-স্বাধীনতা’ বলে যেটা প্রচার করা হচ্ছে, সেরকম কিছুই আমাদের মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে না।

আমরা যৌন-স্বাধীনতা বলতে মনে করি প্রাপ্ত-বয়স্ক নারী-পুরুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, বন্ধুত্ব, মতাদর্শ-গত মিল ইত্যাদির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এক প্রেমময় মানসিক ও শারীরিক সম্পর্ক। এই স্বাধীনতায় শোষণ নেই, কোনও বিনিময় মূল্য নেই। নেই কোনো অজাচার।

এবার আসি ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায়, যা নিয়ে এত হই-চই। এই ধারা অপ্রাকৃতিক অপরাধ সম্পর্কিত। “যদি কেউ স্বেচ্ছাকৃত ভাবে প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে কোনো পুরুষ, স্ত্রী বা পশুর সাথে যৌন সংসর্গ করে-তবে তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা দশ বছর অবধি সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড হবে, এবং সে অর্থদণ্ড দিতেও দায়ী থাকবে। এটা গ্রেপ্তার যোগ্য ও জামিন অযোগ্য অপরাধ।“

পাশাপাশি এই ধরনের মানসিক বিকৃতির ফলে শরীরে বিভিন্ন ধরণের জটিল রোগের দেখাও দিতে পারে।

অশ্লীলতা এড়িয়ে, যথাসম্ভব শোভন / শালীন ভাষায় বলতে পারি, যারা পারস্পরিক ‘সম্মতি’ তে ঘটা সবরকমের যৌন-স্বাধীনতা নিয়ে সরব-তারা কি পিতা-কন্যা, মাতা-পুত্র…এসব ছাড়াও পায়ু-মৈথুনের আইনি অধিকার চাইছেন? এই হলো তাহলে তাদের মতে ব্যক্তিস্বাধীনতা। যৌন-স্বাধীনতা। জানিনা, প্রায় ১২ বছর আগের মতন, আবার স্লোগান উঠবে কিনা-“অমুক খাটিয়ে খাই, তমুকের অধিকার চাই।”

অনেকেই আছেন যারা বিষয়টা নিয়ে হয়তো একটু  বা বেশ বিভ্রান্ত। আবার একটা বড় অংশ সব জেনে বুঝেই চূড়ান্ত যৌন-অজাচারের পক্ষে এক গন-উন্মাদনা করতে চাইছেন। তোল্লাই দিতে চাইছেন এক লুম্পেন সংস্কৃতিকে।  এটা নিঃসন্দেহেই এক সাংস্কৃতিক সন্ত্রাস। এই আগ্রাসন থামাতে প্রয়োজন পাল্টা আগ্রাসনের, যা বয়ে আনবে সুস্থ সংস্কৃতির ঝোড়ো বাতাস, যার শিরায়-শিরায় জানান দেবে দিন বদলের চেতনার তীব্র আকুতি।  তাই, আহ্বান রাখছি সমস্ত সুস্থ চিন্তাসম্পন্ন, সাম্যকামী মানুষের কাছে-আসুন, রুখে দাঁড়ান। কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে আমরা সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলি এই নোংরা সংস্কৃতির বিরুদ্ধে যা সমাজের একটা অংশকে নিশ্চিতভাবেই ঠেলে দিতে পারে সীমাহীন নৈরাজ্য ও অজাচারের অন্ধকার দুনিয়ায়।

এবার দেখা যাক গণসংগঠন গুলির অবস্থা। গোটা রাজ্যে গণসংগঠন গুলির অবস্থা খুবই খারাপ। বেশ কয়েক বছর ধরে গণসংগঠনগুলির কাজে ভাঁটা দেখা যাচ্ছে। বর্তমান আর্থ-সামাজিক অবস্থা, রাজনৈতিক অবস্থা জন্য  নিজের ভিবিষ্যৎ তৈরির অথবা রুটিরুজির পিছনে ব্যস্ত থাকতে গিয়ে মানুষ গণসংগঠন বিমুখ হয়ে পরছেন।

আমাদের সংগঠনের অবস্থাও খারাপের দিকে। কেন্দ্রীয় কমিটি, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া জেলার শাখা গুলি এবং ত্রিপুরা শাখা ছাড়া অন্যান্য জেলায় তেমন কোনও কাজই হচ্ছেনা। কার্যত নিষ্ক্রিয় বেশির ভাগ শাখা।

এই মুহুর্তে দরকার সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার। শাখাগুলিকে কিভাবে চাঙ্গা করা যায় সেই বিষয়ে আলোচনা করে পদক্ষেপ নিতে হবে। সংগঠনের স্বার্থে কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সহ কয়েকটি পদ কোলকাতা অথবা বৃহত্তর কোলকাতার থেকে নির্বাচন করার প্রয়োজন। কাজ করতে পারবেন, সময় দিতে পারবেন এমন মানুষ দরকার।  সদস্য বাড়ান যায় কী ভাবে সে বিষয়ে নজর দিতে হবে। তাইবলে যে কোনও ব্যক্তিকে দলে ঢুকিয়ে শুধু মাত্র দল বাড়ালেই চলবে না। আবার ভাঁড়া করা সৈন্য দিয়েও এই কর্মকান্ড সম্ভব নয়। তাই কাজ করতে পারবে এমন মানুষদের একত্রিত করতে হবে।১৯৯৩ সালে সমিতি গঠনের পর থেকে প্রবীর ঘোষ ও সুমিত্রা পদ্মনাভন দীর্ঘ বছর ধরে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে ‘চিন্তা’, ‘পরিকল্পনা’-র পাশাপাশি পথে নেমে কাজ করে একের পর এক জয় ছিনিয়ে এনেছেন। কিন্তু এই দুইজনের বয়স বাড়ার পাশাপাশি শারীরিক সমস্যার কারণে শুধু মানসিক জোরে সব সময় রাস্তায় নেমে এঁদের পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। এঁদের কাছ থেকে ‘চিন্তা’, ‘পরিকল্পনা’, ‘আন্দোলনের রূপরেখা’  আমরা সবসময়য় পেয়ে থাকবো, কিন্তু পথে নেমে কাজ করার জন্য সক্রিয় কিছু নেতা-কর্মী দরকার।  জেলা গুলিকেও সংগঠিত করার উপায় নিয়ে চিন্তা ভাবনা করতে হবে। আন্দোলনের ক্ষেত্রে আর একটি বড় সমস্যা ‘অর্থ সমস্যা’। কেন্দ্রীয় কমিটির ফান্ডের অবস্থা খুবই খারাপ। অর্থ সমস্যা এত প্রবল যে, সমিতি-র ওয়েব সাইটটিকে রাখা যাবে কিনা সেটাও প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা সরকারী অথবা বিদেশী কোনও আর্থিক অনুদান নিইনা। তাই আমাদেরই উদ্যোগী হয়ে আর্থিক সহযোগিতা করে একটা ফান্ড করা খুবই দরকার। না হলে সমিতির কর্মকান্ড থমকে যাবে।

ছোট-ছোট কাজ দিয়ে তাঁদের কর্মকান্ড শুরু করতে পারে শাখাগুলি। বিশাল কাজের ক্ষেত্র রয়েছে আমাদের সামনে। বিনা খরচে বস্তি ও গ্রামের ব্রাত্য শিশুদের এবং বয়স্কদের শিক্ষা, আইনি সাহায্য, কর্মশিক্ষা, চিকিৎসকদের নিয়ে গ্রামে গ্রামে ক্যাম্প, পারিবারিক সমস্যা নিয়ে কাউন্সেলিং, মরণোত্তর দেহদান ও চক্ষুদান, রক্তদান শিবির, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বেশ্যাবৃত্তির মতো নিষ্ঠুর ব্যবস্থা বন্ধ করে তাদের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করার জন্য সরকারকে চাপ দেওয়া, মানবতা বিকাশের স্বার্থে মানুষকে ধর্ম, জাত-পাত, প্রাদেশিকতা ও লিঙ্গবৈষম্যের মত কুসংস্কার ত্যাগ করতে উদ্ধুদ্ধ করা। সমিতির ওয়েবসাইটটি লেখার অভাবে নিয়মিত আপডেট করা যাচ্ছে না। সদস্যদের উচিত সমসাময়িক বিষয় থেকে শুরু করে নানা বিষয় ভিত্তিক লেখা পাঠিয়ে সহযোগিতা করা।

নানা সমস্যার মধ্যেও ডাইনি প্রথা বিরোধী, বাল্য বিবাহ বিরোধী একের পর এক কাজ করে গেছে বাঁকুড়া এবং পুরুলিয়া জেলার শাখাগুলি। এর জন্য ধন্যবাদ এই জেলা দুটির সদস্যদের। ত্রিপুরা শাখাও একের পর এক কাজ করেছে। মরণোত্তর দেহদান, চক্ষুদান, ধর্ম কলামে ‘মানবতা’ লেখা নিয়ে কাজ করছেন ওখানকার সদস্যরা। ধন্যবাদ ত্রিপুরার সদস্যদেরও।

সবশেষে বলি হতাশা দূরে সরিয়ে রেখে আসুন আমরা সবাই মিলে আলোচনা করে সমিতির কর্মকান্ড চালিয়ে রাখতে সাহায্য করি।  তবে আলোচনা করে চুপচাপ বসে থাকলে হবে না। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

সবাইকে শুভেচ্ছা। অভিনন্দন।

ধন্যবাদ।

HA - Protibedon

সঞ্জয় কর্মকার
সাধারণ সম্পাদক
হিউম্যানিস্ট অ্যাসোসিয়েশন

Share

Leave a Reply

 

 

 

You can use these HTML tags

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>