‘রবীন্দ্রনাথের জন্য ছুটি দেবই সাফ কথা মমতার’ —— আনন্দবাজার পত্রিকা

গত ৩১ জুলাই আনন্দবাজার পত্রিকার “রবীন্দ্রনাথের জন্য ছুটি দেবই সাফ কথা মমতার” পড়ে কয়েকটি কথা ব্যক্ত করতে চাইছি। কথাগুলি বলার কারন এই যে, যখন পশ্চিমবঙ্গের প্রায় বেশীরভাগ সংবেদনশীল সাধারন মানুষ মমতা সরকারের প্রশাসনিক তৎপরতাকে প্রশংসার সাথে মেনে নিচ্ছে, সেই সময় এই হঠাৎ পদক্ষেপ রাজধানীর গতিতে ব্রেক কষা হল না কী? তার সাথে দূষ্টু সাংবাদিকদের প্রশ্নের খোঁচায় তিনি যখন জোর করে বলেন, “রবীন্দ্রনাথের জন্য ছুটি দিতে হলে বার বার দেবেন”- সেটি মমতার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গির সাথে খাপ খেলেও খাপ খায় না প্রশাসনিক এমার্জেন্সির কর্মতৎপরতার সাথে। মমতাদেবী ভুলে যাবেন না, বাম জমানার গয়ংগচ্ছ ঢিলেঢালা ভঙ্গিমা ছেড়ে সরকারি কর্মচারিরা  আপনারই দেওয়া ছূটি বাতিলের সার্কুলেশনকে সাদরে মেনে নিয়েছে, তাদের এতদিনের ফাঁকিবাজির অভ্যাস কষ্ট করে নষ্ট করেছে আপনার পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি এবং কাজ করার তাগিদের জন্য। তারা এই রবীন্দ্র বাড়াবাড়িকে কী চোখে দেখছে একবারও ভেবে দেখেছেন? কেন্দ্রিয় এবং রাজ্য সরকার গত দেড় বছর ধরে যেভাবে সার্ধ শতবর্ষের নামে লেবু কচলে তেতো করছেন তাতে আমজনতার রবীন্দ্রপ্রীতি কতটা বাড়ছে বলা শক্ত তবে রবীন্দ্রনাথ যে গান্ধীজি, আম্বেদকর, সর্বপল্লী রাধাকৃ্ষ্ণণের মত রবীন্দ্রআদর্শ বিহীন মনীষিতে পরিনত হতে যাচ্ছেন তা নিশ্চিত। কংগ্রেসের টপ টু বটম কোন নেতা টি গান্ধির অহিংস নীতিতে বিশ্বাস করে বলুন তো? তারা সবাই ভোটে জেতে পেশীশক্তির জোরে, আদিবাসীদের জল-জঙ্গল-জমি দখল করে সেনা নামিয়ে। আম্বেদকর সংরক্ষণ নীতি এমন ভাবে শুরু করেছিলেন যাতে দু তিন দশকের মধ্যে দলিত শ্রেণিরা সমাজের ওপরের দিকে উঠে আসতে পারে। তার মতামত কে জলাঞ্জলি দিয়ে প্রতিটি রাজনৈতিক দল সংরক্ষণ নিয়ে ভোট ভোট খেলা খেলছে। প্রতি বছর ঘটা করে শিক্ষক দিবস পালন করেও পেশাগত ভাবে অবনমনের তালিকায় শিক্ষকের স্থান আজ দু নম্বরে, ডাক্তারের পরেই। মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী ভেবে দেখা উচিৎ, প্রায় প্রতিটি মনীষীরই এরকম অবস্থা, তারা এক বলে গেছেন, করি আমরা উলটো। এটাই আমাদের রেওয়াজ, এটাই আমাদের সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা হলাম বিশ্ব আঁতেল। রবীন্দ্রনাথের গান গাই, পদ্য বলি ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে, চোখ বেঁকিয়ে বেঁকিয়ে। আসলে আমরা মুখস্ত বলি। আত্তীকরন করিনা। করলে এত অপকর্ম আমাদের দ্বারা হত না।

এই পরিবর্তনের সময়ে আপনি যদি ভাবতেন যে, রবি ঠাকুর বলে গেছেন- “সমবায় প্রনালীতে জীবিকানির্বাহই আমাদের দেশকে দারিদ্র্য বাঁচাবার একমাত্র উপায়…………শুধু আমাদের দেশ কেন পৃ্থিবীর সকল দেশেই এই প্রনালী একদিন বড় হইয়া উঠিবে”। তাহলে এক কাজ করা যাক, রবি ঠাকুরের সমবায় চিন্তার যে যে দিকগুলি একবিংশ শতাব্দীতেও প্রযোজ্য সেগুলি প্রয়োগ করে কোটরে ঢুকে যাওয়া কুটির শিল্প এবং সমবায় দপ্তর কে ঢেলে সাজাই। রবি ঠাকুর যেহেতু বলেছেন “ ধনের পুজা প্রবল হয়ে উঠেছে………ধনলোভের মত এমন নিষ্ঠুর এবং অন্যায়পরায়ণ প্রবৃত্তি আর নেই”। তাহলে সামনের মরসুমে পাঠশালা থেকেই তার এরকম কোটেশন গুলি ছাত্রছাত্রীদের মনে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। বিশ্বকবির বিখ্যাত ‘রাজর্ষি’ কে সম্মান দিয়ে অন্তত ধর্মের নামে নির্বিচারে হাজার হাজার পশুবলি বন্ধ করা যেত। কিছু না পারলেও বাঁকুড়া জেলার যে কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছোট ছোট শিশুদের সামনে মনসা পুজো উপলক্ষ্যে ঝপাঝপ বলি হতে থাকে সেই বীভৎসতা বন্ধ করার প্রজেক্ট নেওয়া যেত। জানেন কি হাজার প্রতিবাদ সত্বেও ঐ বিদ্যালয়গুলির কমিটি এবছরও পয়লা ভাদ্র পশুবলি করব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আপনার জানার কথা কেননা প্রশাসন কে যে চিঠি দেওয়া হয়েছে তার কপি আপনাকেও দেওয়া হয়েছে। জানিনা কচি মন গুলির চোখের সামনে যখন রক্ত-লীলার হোলি হবে তখন আপনি রবি ঠাকুর নিয়ে কি প্ল্যান করবেন। রবীন্দ্রনাথের দাও ফিরে সে অরণ্য লও এ নগর কে স্লোগান করে আগামী পাঁচ বছরের বৃক্ষ রোপনের একটা লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা যেত না কী? বাম জমানায় শুয়ে যাওয়া শিক্ষা ব্যবস্থা কে রবি ভাবনায় শিক্ষিত করার প্রজেক্ট নেওয়া যায় নিশ্চয়?

রবীন্দ্রনাথ কেন যে কোনো মনীষী কেই সম্মান জানানো যায় তার চিন্তা, তার আদর্শ, তার স্বপ্নকে পূর্ণ করার মাধ্যমে। তাকে নিয়ে হাজার নাচানাচি বা আঁতলামোর মাধ্যমে নয়।

Share

Leave a Reply

 

 

 

You can use these HTML tags

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>