যৌন-স্বাধীনতা না চূড়ান্ত অজাচার???

প্রবীর ঘোষ

গত ১১-ই ডিসেম্বর, ২০১৩, ভারতের শীর্ষ আদালত জানালো, সমকামিতা বা সম-লিঙ্গ প্রেম অসাংবিধানিক ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আদালত এই রায় দিলেন ভারতীয় দণ্ডবিধির ধারা ৩৭৭ অনুযায়ী।

ঠিক তার পর দিন থেকেই, দেশের ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার একটা বিরাট অংশ সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে হাহাকার করে উঠলো। এই আস্ফালনে সামিল করা হলো, বলিউড থেকে টলিউডের বিভিন্ন সেলেব্রিটিদের। দুর্নীতিতে ডুবে থাকা কেন্দ্রীয় সরকারের ‘মহামাতা’ শ্রীমতী সনিয়া এবং তাঁর আস্তাবলের দুই ‘নন্দী-ভৃঙ্গী’ জানালেন যে সরকার এই রায়ের বিপক্ষে, কারণ, এটা নাকি ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারে হস্তক্ষেপ!!! ওয়াহ! ক্যা বাত হ্যায়! ভারতে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী সমস্ত আইনের পক্ষে চিকন গলা তোলা এই সব সন্ত্রাসবাদের বাবা-মায়েরা উতলা হচ্ছেন স্বাধীনতা, গণতন্ত্র নিয়ে!

আমরা এটাও লক্ষ রাখছি যে সমকামিতার পক্ষ নিয়ে বক্তব্য রাখছেন কিছু রাজনৈতিক দল, কারণ, শেষমেশ ‘সমকামী’ রাও তো তাদের কাছে এক ‘ভোট-ব্যাঙ্ক’।

এই বিষয়ে আমরাও বহু প্রশ্নের সম্মুখীন। কারণ, আমাদের অবস্থান এই তৈরি করা হুজুগের বিরুদ্ধে। হ্যাঁ, আমরা বিজ্ঞানের, প্রগতির, স্বাধীনতার, যুক্তির এবং সাম্যের পক্ষে, এবং তাই দ্বিধাহীন ভাবে কোর্টের এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছি। অনেকেই আমাদের এই অবস্থানে ক্ষুব্ধ হয়েছেন, বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, এই হঠাৎ গজিয়ে ওঠা হুজুগের স্রোত-এর উল্টোদিকে সাঁতার কাটতে দেখে।

বিভিন্ন গণমাধমের খবর পড়ে-শুনে মনে হচ্ছে, ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা কে যারা ধিক্কার জানাচ্ছেন, তাদের প্রতিবাদের মুল সুর হলো যে এটা কোনও ব্যক্তির নিজের পছন্দ মতো যৌন-সঙ্গী বেছে নেবার ‘মৌলিক অধিকার’-কে লঙ্ঘন করে। অর্থাৎ কিনা, এই রায় যৌন-স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ।

তাহলে, প্রথমে আমরা মৌলিক অধিকার দিয়ে শুরু করি। ভারতীয় সংবিধানের তৃতীয় খণ্ডে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার গুলো লেখা আছে। এই অধিকার গুলোকে ৬ ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে, যেমন :-

১। সাম্যের অধিকার

২। স্বাধীনতার অধিকার

৩। শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার

৪। ধর্মীয় অধিকার

৫। সংস্কৃতি ও শিক্ষা বিষয়ক অধিকার

৬। শাসন-তান্ত্রিক প্রতিবিধানের অধিকার

সুতরাং, ‘যৌন-স্বাধীনতা’ বলে যেটা প্রচার করা হচ্ছে, সেরকম কিছুই আমাদের মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে না।

আচ্ছা, নাই বা থাকলো, আসুন দেখি আমরা যুক্তির চোখে যৌন-স্বাধীনতা বলতে কি বুঝি। আমরা যৌন-স্বাধীনতা বলতে মনে করি প্রাপ্ত-বয়স্ক নারী-পুরুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, বন্ধুত্ব, মতাদর্শ-গত মিল ইত্যাদির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এক প্রেমময় মানসিক/ শারীরিক সম্পর্ক। এই স্বাধীনতায় শোষণ নেই, কোনও বিনিময় মূল্য নেই। নেই কোনো অজাচার।

যারা চীৎকার করে ‘পারস্পরিক সম্মতি’-তে গড়ে ওঠা সমস্ত যৌনসম্পর্ক-কেই স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে স্বীকৃতি দিতে চাইছেন, তাদের কাছে প্রশ্ন-আপনারা নিশ্চয়ই পিতা-কন্যা, মাতা-পুত্র, ভাই-বোন ইত্যাদির মধ্যে পারস্পরিক সম্মতিতে গড়ে ওঠা যৌন-সম্পর্ককেও উদাত্ত কণ্ঠে স্বাগত জানাবেন। স্বীকৃতি দেবেন যৌন-ব্যবসাকেও। যদি আপনাদের পরিবারের কেউ বা নিকটজন এই ব্যাবসায় আসতে চায়, নিশ্চয়ই উচ্ছ্বসিত বোধ করবেন। যদি বলেন ‘না’, তবে আপনাদের ‘যুক্তি’-র জালে নিজেরাই জড়িয়ে যাবেন, কারণ, এখানেও আছে যৌন-সঙ্গী বেছে নেবার ( আপনাদেরই ভাষায় ) অবাধ স্বাধীনতা ।

এবার আসি ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায়, যা নিয়ে এত হই-চই। এই ধারা অপ্রাকৃতিক অপরাধ সম্পর্কিত। কি বলা আছে সেখানে? যা আছে, অবিকৃতভাবে এখানে তুলে দিলাম-“ যদি কেউ স্বেচ্ছাকৃত ভাবে প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে কোনো পুরুষ, স্ত্রী বা পশুর সাথে যৌন সংসর্গ করে-তবে তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা দশ বছর অবধি সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড হবে, এবং সে অর্থদণ্ড দিতেও দায়ী থাকবে।

এটা গ্রেপ্তার যোগ্য ও জামিন অযোগ্য অপরাধ।

ব্যাখ্যা-এই ধারায় বলা অপরাধের জন্য যৌন সংসর্গে লিঙ্গ প্রবিষ্ট হলেই যথেষ্ট হবে।“

যারা এই ধারা বাতিলের দাবী নিয়ে, যৌন-স্বাধীনতার ধ্বজা ধরে গলা ফাটাচ্ছেন, তাদের কাছে বিনীত ভাবে জানতে চাই- কোনো সমকামী ‘দম্পতি’-র মধ্যে যৌন সংসর্গ কিভাবে সম্ভব, যা আপনাদের মতে প্রকৃতির নিয়ম মেনে বা না মেনে? পুরুষের সঙ্গে পুরুষের? নারীর সাথে নারীর? অথবা পুরুষ বা নারীর সাথে কোন পশুর???

অশ্লীলতা এড়িয়ে, যথাসম্ভব শোভন/ শালীন ভাষায় বলতে পারি, যারা পারস্পরিক ‘সম্মতি’ তে ঘটা সবরকমের যৌন-স্বাধীনতা নিয়ে সরব-তারা কি পিতা-কন্যা, মাতা-পুত্র…এসব ছাড়াও পায়ু-মৈথুনের আইনি অধিকার চাইছেন? এই হলো তাহলে তাদের মতে ব্যক্তিস্বাধীনতা! যৌন-স্বাধীনতা! জানিনা, প্রায় ১২ বছর আগের মতন, আবার স্লোগান উঠবে কিনা-“অমুক খাটিয়ে খাই, তমুকের অধিকার চাই।”

অনেকেই আছেন যারা বিষয়টা নিয়ে হয়তো একটু  বা বেশ বিভ্রান্ত। আবার একটা বড় অংশ সব জেনে বুঝেই চূড়ান্ত যৌন-অজাচারের পক্ষে এক গন-উন্মাদনা করতে চাইছেন। তোল্লাই দিতে চাইছেন এক লুম্পেন সংস্কৃতিকে।

এটা নিঃসন্দেহেই এক সাংস্কৃতিক সন্ত্রাস। এই আগ্রাসন থামাতে প্রয়োজন পাল্টা আগ্রাসনের, যা বয়ে আনবে সুস্থ সংস্কৃতির ঝোড়ো বাতাস, যার শিরায়-শিরায় জানান দেবে দিন বদলের চেতনার তীব্র আকুতি।

তাই, আহ্বান রাখছি সমস্ত সুস্থ চিন্তাসম্পন্ন, সাম্যকামী মানুষের কাছে-আসুন, রুখে দাঁড়ান। কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে আমরা সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলি এই নোংরা সংস্কৃতির বিরুদ্ধে যা সমাজের একটা অংশকে নিশ্চিতভাবেই ঠেলে দিতে পারে সীমাহীন নৈরাজ্য ও অজাচারের অন্ধকার দুনিয়ায়।

সংঘর্ষ অবশ্যম্ভাবী, নির্মাণও।

আমরা প্রস্তুত।

Share

Leave a Reply

 

 

 

You can use these HTML tags

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>