ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি –র কেন্দ্রীয় কমিটির বার্ষিক সম্মেলনে পেশ করা সম্পাদকীয় প্রতিবেদন

ভারতীয় বিজ্ঞান যুক্তিবাদী সমিতি

২৯ তম সম্মেলন,     ১ মার্চ, ২০১৪

স্থানঃ পি অ্যাণ্ড টি কমিউনিটি হল, যশোর রোড, কলকাতা- ৭০০০২৮

সাধারণ সভায় পেশ করা সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট

বয়ে চলা সময়ে সময়ের চেয়ে পিছিয়ে থেকে নয়, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে নয় বরং সময়ের চেয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে যাত্রা শুরু যুক্তিবাদী সমিতির। আজও সমিতির সেই ধারা বর্তমান। ঝাড়ফুঁক-তুকতাকের মত কুসংস্কার ঠেকাতে আজ এই দেশেরই কিছু বিজ্ঞান আন্দোলন কর্মী  কুসংস্কারবিরোধী আইন প্রনয়ন করতে কঠিন লড়ায়ে নেমেছেন, যুক্তিবাদী সমিতি কিন্তু গত তিরিশ বছর ধরে  দুটি আইনের সাহায্য নিয়ে জ্যোতিষ-ওঝা-গুনিন-তান্ত্রিকদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। যুক্তিবাদী সমিতির বক্তব্য- নতুন নতুন গালভরা আইন নয়, বর্তমান আইনগুলির সঠিক প্রয়োগ হোক না- তাতেই বুজরুক অবতারদের বিরুদ্ধে লড়া যাবে। নতুবা শোকেসে বন্দি নতুন আইনে কাজের কাজ কিছুই হবেনা। একবার ভেবে দেখুন তো, রাষ্ট্র কি আদৌ দেশকে কুসংস্কার মুক্ত করতে চায়? নাকি নিত্য নতুন আইন প্রবর্তনের মাধ্যমে জনগনকে ধোঁকা দেওয়াটাই উদ্দেশ্য। যেখানে কড়া আইনগুলির প্রয়োগ হচ্ছে না, সেখানে নতুন করে আইন প্রবর্তনের উদ্দেশ্য কী?

আমাদের নতুন করে ভাবতে হচ্ছে বন্ধু, বিজ্ঞান সচেতনতার রাষ্ট্র নামে আমাদের ধোঁকা দিচ্ছে না তো? দিল্লিতে বিজ্ঞান-চিন্তা প্রসারের জন্য বড় বড় সেমিনার হচ্ছে অথচ সেমিনারের বিষয়বস্তু ফাইলবন্দি হয়ে থাকছে। রাষ্ট্রপতি ব্যস্ত থাকছেন দূর্গাপূজায়। ডাইনিপ্রথা বিরোধী ফিল্ম বানানো হচ্ছে, সেই ফিল্মে আমাদের সোচ্চার উপস্থিতিও থাকছে, অথচ রাজ্য সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেই ফিল্ম গ্রামে গ্রামে প্রদর্শিত হচ্ছেনা। ডাইনিপ্রথা বিরোধী কাজকর্মের জন্য কোনো একজনকে বঙ্গভূষন দেওয়া হচ্ছে অথচ ডাইনি সন্দেহে নির্যাতনের ঘটনায় প্রশাসন নিশ্চুপ থাকছে। সরকারেরই এক নম্বর সারির মন্ত্রীরা মহাকরণে ভুত দেখছেন, কামাখ্যা মন্দিরে পশুবলি দিচ্ছেন।

সমিতি প্রতিষ্ঠা যখন হয় তখন রাজ্যে ছিল বামফ্রণ্টের সরকার। যারা মুখে সাম্যবাদের কথা বলে, বিজ্ঞান সচেতনতার কথা বলে অথচ কাজে কিচ্ছুটি করেনা। আমাদের সমিতির আন্দোলনের পালে হাওয়া টানতে বামফ্রণ্টের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ মদতে পরপর গজিয়ে উঠতে লাগলো বিজ্ঞান সংগঠন। সিপিএমের মদতে সমিতিকে ভেঙ্গে দেওয়ার চেষ্টা হল বেশ কয়েকবার। বাম সরকার ছিল মুখে এক, কাজের বেলা আর এক। আমাদের লড়াই করতে হত মুখোশের সাথে। সে লড়াই ছিল খুব কঠিন। কিন্তু এখন আমরা লড়াই করছি মুখের সাথে। বর্তমান তৃণমুল সরকারের নেতা মন্ত্রীরা প্রকাশ্যেই ধর্মের ঝাণ্ডা বহন করেন, নিজেদের কুসংস্কারের কথা বড়াই করে বলেন। সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে রামকৃষ্ণ মিশন, মাদ্রাসাদের অন্যায় সুযোগ সুবিধে দেন। তাই বর্তমানে আমাদের সমিতির লড়াই আরও অনেক বেশি প্রকাশ্য। এই কথা ওঠার কারন হল, বিগত দুতিন বছরে শাখাগুলি কয়েকজন বাবাজি-মাতাজির বিরুদ্ধে লড়ায়ে নেমে প্রশাসনের কাছ থেকে বিন্দুমাত্র সাড়া পায়নি। সমিতির কিছু কিছু সদস্যের গলায় শোনা গিয়েছিল হতাশার সুর। কামদুনি কাণ্ডের পর রাজ্যে বেড়ে চলা ধর্ষনে বিরুদ্ধে আমরা যখন কলকাতার রাজপথে মিছিল করি, আমাদের মিছিল আটকে দেয় তৃণমুল সরকারের বিশাল পুলিশ বাহিনী। পরদিন সরকারের পাপোশ সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় আমাদের সমিতিকে দেগে দেওয়া হয় মাওবাদীদের গণ সংগঠন বলে। তাই বন্ধুরা, হতাশা নয়, প্রকৃত অবস্থাটা বুঝে নিয়ে সরাসরি নেমে পড়ুন এই অসম লড়াই-এ।

আমাদের ওয়েবসাইট পৃথিবীর জনপ্রিয়তম রাশন্যালিষ্ট ওয়েবসাইট গুলির মধ্যে অন্যতম। সেখানে আমাদের পত্রিকা হাজার হাজার কপি ডাউনলোড হয়। আমাদের আর্টিকেল পড়ে মন্তব্য করেন দেশ বিদেশের বহু বিশিষ্টজনেরা। কেন্দ্রিয় কমিটির ফেসবুক পেজ এবং শাখাগুলির ফেসবুক পেজে মেম্বাররা হামলে পড়ে ঢেউএর মত। তর্কে বিতর্কে মন্তব্যে সবসময় সরগরম। বিবেকানন্দের হুজুগের একমাত্র বিরোধী আমরাই। যখন সারা ভারতের প্রায় সব বামপন্থী এবং দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দল এবং তাদের লেজুড় গনসংগঠনগুলি সমকামিতা, পশুকামিতা বিরোধী ৩৭৭ ধারা বাতিল করতে চাইছে, একমাত্র আমরাই চাইছি ৩৭৭ ধারা থাকুক, থাকুক ‘পিটা’ আইন। আমাদের সমিতির সদস্যরা গ্রামে গঞ্জে, স্কুল কলেজে, মেলায় কুসংস্কার মুক্তির অনুষ্ঠান করছেন। ফাঁস করা হচ্ছে বিভিন্ন বাবাজী, মাতাজীদের অলৌকিক কান্ড কারখানা। শোষিত মানুষকে বোঝানো হচ্ছে তাদের বঞ্চনার কারনগুলি। নাবালিকা বিয়ে থেকে ডাইনি সন্দেহে অত্যাচার, বাড়িতে হিজড়ের অত্যাচার থেকে ভুতের আতঙ্ক – যুক্তিবাদীরা ছুটে যাচ্ছে সর্বত্র। মানুষ পুলিশকে ফোন করার আগে ফোন করে সাহায্য চাইছেন আমাদের কাছে। আমাদের শাখা সংগঠনের সম্পাদকদের ফোন নম্বরগুলি জনগনের কাছে হেল্প লাইনে পরিণত হয়েছে। ‘আমরা যুক্তিবাদী’ পত্রিকার বিক্রিও বেশ উল্লেখযোগ্য ভাবেই বেড়েছে। বিভিন্ন শাখা থেকে নিয়মিত ভাবে শাখা সংগঠনের পত্রিকা বের হচ্ছে। শোষকশ্রেনীর বাজারি পত্রিকার মগজধোলায়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদের পত্রিকাগুলি পাল্টা মগজধোলাই চালাচ্ছে। আর এজন্য কোনো ভাড়াটে লেখকের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। লিখছেন সমিতির সদস্যরাই।

যুক্তিবাদী সমিতির জন্মলগ্ন থেকেই প্রচুর প্রচুর মানুষ আমাদের সাথে সহযোদ্ধা হয়েছেন। একই অঞ্চলের সমমনষ্ক ব্যক্তিরা মিলে শাখা গঠন করে আমাদের সাথে একযোগে কাজ চালিয়ে গেছেন। তারা আমাদের প্রচুর লড়াইতে জয় এনে দিয়েছেন। তবু কোথায় যেন একটি অপূর্ণতা ছিল। ২০০৯ সালের সম্মেলনে এই নিয়ে আলোচনাও হয়। পাঁচ বছর আগের সম্মেলনে উঠে আসা প্রস্তাব এবছরেই যেন পূর্ণতা পেল। কেন্দ্রিয় কমিটির উপর নির্ভরতা কাটিয়ে সমিতির শাখাগুলি স্বাধীন ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এবং আমাদের কাছে আনন্দের খবর এই যে, পুরুলিয়া, মানবাজার, আগরতলা, কমলপুর, ধলাই, আদ্রা, বাঁকুড়া, বর্ধমান, ঘাটাল- সব শাখাই অর্থ বা মানবসম্পদ কোনোটাতেই  কেন্দ্রিয় কমিটির উপর বিশেষ ভাবে নির্ভরশীল নয়। আন্দোলন ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি সমষ্টিতে ছড়িয়ে পড়া শুরু হয়েছে বলে আমরা মনে করি। আরও আরও জয় চাই, আরও বেশি করে মানুষের কাছে পৌঁছানো চাই। আগামিতে এই লক্ষ্য রেখেই আজকের সম্মেলন শুরু হোক।

SRAI - Protibedon

বিপ্লব দাস
সাধারণ সম্পাদক
ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি

Share

Leave a Reply

 

 

 

You can use these HTML tags

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>