পুলিশ, প্রশাসন, পরিবেশ দফতর কার কাছে যাব আমরা

সম্পাদক সমীপেষু …
পুলিশ, প্রশাসন, পরিবেশ দফতর কার কাছে যাব আমরা
অমিতাভ গুপ্তর ‘বাঁচাও পুজো এসে গেছে’ (২১-১০) প্রবন্ধটি পড়ে বুকে বল পেয়ে একটা-দুটো কথা বলতে চাইছি। বিশেষ করে কলকাতার বাইরে এ বঙ্গের শ’খানেক মফস্সলের কোটি দেড়েক মানুষের সমস্যা বিষয়ে।
১৯৯৬ সালের এপ্রিলে মাননীয় বিচারপতি ভগবতীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক রায়ের পর দেখলাম মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে কলকাতা প্রায় শব্দবাজি-মুক্ত। মাইকের আওয়াজও অনেকাংশে কমে এল। এখনও সেই রেশ কেটে যায়নি। ১৯৯৬ সালের আগে কলকাতায় যে নির্মম শব্দতাণ্ডব ছিল, সেই অবস্থা এখনও ফিরে আসেনি।
কিন্তু মফস্সল শহরের ইতিহাস অন্য কথা বলে। ১৯৯৬ সালের শব্দদূষণ রায়ের ঢেউ এখানকার প্রশাসনে লেগেছিল আরও তিন-চার বছর পরে, ২০০০ সাল নাগাদ। কিন্তু মাত্র বছর পাঁচেকেই পাল্টা পরিবর্তনের হাওয়া লেগে যায় এবং এর পরেই শব্দতাণ্ডব তার পুরনো ফর্মকেও ছাপিয়ে যায়। বাঁকুড়া-পুরুলিয়া-পশ্চিম মেদিনীপুর-বর্ধমান-বীরভূমে মাইকের তাণ্ডব শুরু হয় অগস্টের মনসাপুজো দিয়ে। যেহেতু পুরুলিয়া এবং বাঁকুড়ার কিছু কিছু অঞ্চলে মনসার জৌলুস দুর্গার চেয়ে বেশি, ফলত মনসার বিসর্জনেই ষোলোটি বিশালকায় লাউড স্পিকার সমন্বয়ে এক-একটি তিন চাকাওয়ালা ঠেলাগাড়ি এগিয়ে চলে। এ রকমই ধারা চলে অগস্টের মনসা থেকে দুর্গা, জগদ্ধাত্রী, ঈদ, কালী, কার্তিক হয়ে নভেম্বর-জানুয়ারির পিকনিকের মরসুম পর্যন্ত।

এর সঙ্গে আছে সারা বছর ধরেই কোনও না কোনও পাড়ায় হওয়া পাঁচ দিন ধরে অসহ্য শব্দদূষণের ষোলোআনা কমিটির পুজো। ধনী ব্যবসায়ী-পুত্র বিয়ে করতে যাচ্ছেন, শোভাযাত্রাতে উদ্দাম নৃত্য এবং মাইক রাখবেনই। প্রশাসনের নির্লিপ্ততায় বিচারক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রায়ের রেশ মানুষের মন থেকে এতটাই মিলিয়ে গেছে যে, পিকনিকের ছোকরারাও যাওয়া-আসা এবং পিকনিক চলাকালীন এ ভাবেই মাইক ব্যবহার করে উদ্দাম নৃত্য করতে থাকে।
এই অবস্থার কিছু পরিবর্তন করা যায় কি না ভেবে ২০১১ সালের ১৫ অগস্ট বাঁকুড়া শহরে এই জেলার ১৫টি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মিলে আলোচনায় বসি এবং এই মর্মে ১৬ তারিখ বাঁকুড়া সদর মহকুমা শাসককে একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
দু’দিন বাদেই মনসাপুজো, অথচ প্রশাসনের চিরাচরিত ঢিলাঢালা ভাব দেখে ১৭ তারিখ মনসাপুজো কমিটিগুলির বিরুদ্ধে বাঁকুড়া এসডিও কোর্টে পিটিশন শুট করি। বিচারকের অর্ডার বেরোয় বিকেলে। এর পর শহরের বেশ কয়েক জন যখন বিচারকের অর্ডারের প্রতিলিপি নিয়ে বাঁকুড়া সদর থানার ওসি-র সঙ্গে দেখা করতে যাই, আমাদের দেখেই তিনি তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন এবং বলেন, আমি কোনও মাইক বন্ধ করতে যাব না। সরকার আমাকে ডেসিবল মাপার যন্ত্র দিয়েছে কি? আপনারা যা খুশি করুন। পুলিশের এই ঔদ্ধত্য আবার বুঝিয়ে দিল রাস্তা আটকে, কান ঝালাপালা করে, পাবলিকের বারোটা বাজিয়ে এরা পুলিসের কাছ থেকে কোন জাদুবলে পুজোর পারমিশন পায়! এর মাত্র চার দিন আগেই ১২ অগস্ট সল্টলেকের পরিবেশ ভবনে অফিসারদের এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত ছিল, পুজো মরসুমে শব্দদূষণ মোকাবিলায় পরিবেশ দফতর ও রাজ্য পুলিশ হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করবে।
এ সব পুজোর অনুমতি যাঁরা দেন, সে সব প্রশাসনিক কর্তাকে ছুটিতে ফোনে পাওয়া যায় না। পুলিশের কাছে গেলে শব্দ মাপার যন্ত্র না-থাকার অজুহাত। প্রতিটি পুজো কমিটির সম্পাদক-সভাপতি হয় এলাকার কাউন্সিলর, বিধায়ক, সাংসদ, নয়তো নামী ডাক্তার, উকিল, ধনী ব্যবসায়ী। পাবলিক জানে, তাদের ধড়ে একটাই মাথা। তবে কোথায় যাবে তারা? কোথায় প্রশ্ন করবে, কেন প্রতিটি মহকুমায়, নিদেনপক্ষে প্রতিটি জেলায় একটিও শব্দ মাপার যন্ত্র নেই? কেন প্রতিটি পুজো কমিটি তাদের মণ্ডপের সামনে নিজেদের খরচে শব্দদূষণ বিরোধী হোর্ডিং রাখতে বাধ্য হবে না যেখানে লোকাল থানা, বিডিও, এসডিও, দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের ফোন নম্বর জ্বলজ্বল করবে? কেন পুজো মরসুমের আগে থেকেই প্রশাসন বাজির দোকান বা কারখানাগুলিতে তল্লাশি চালাবে না? স্পনসরার এবং অ্যাডভার্টাইজারের চাপে পুজোর প্যান্ডেল রাস্তা সঙ্কুচিত করে ন’দিন ধরে থাকছে কেন?
বিপ্লব দাস। স্কুলডাঙা, বাঁকুড়া

[আনন্দবাজার পত্রিকা—৮ নভেম্বর ২০১২]

Share

Leave a Reply

 

 

 

You can use these HTML tags

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>