নারী-পুরুষে সুস্থ প্রেম ও যৌনজীবন শ্রেয়

শমীন্দ্র ঘোষ

বিশ্ব তোলপাড় সমকামীতার পক্ষে-বিপক্ষে। ভারতেও তাই। আসছে আরও বহু “কামচিন্তা”। একত্রে নাম দিলাম “নব্যলিঙ্গ বিশৃংখল চিন্তা” বা “NEO-GENDER DISORDER THOUGHT”; সংক্ষেপে “নব্যলিঙ্গ” বা “Neo Gender” চিন্তা। অনেকে বলছে এসব নাকি প্রাকৃতিক, স্বাভাবিক। দেখা যাক:

একধরনের ক্রিমি, গাছ উকুন, কিছু মৌমাছি, জলজ কীট, কিছু বিছা, পরজীবি কীট “পার্থেজেনোসিস” পদ্ধতিতে বংশবৃদ্ধি করে একই দেহে উভলিঙ্গ থাকায় বা প্রাকৃতিক “ক্লোন” করে। ওটা ওদের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য। কীটের মতো জীবনযাপন মানুষের শোভা পায়! বাংলা ভাষায় “গাড়ি” ক্লীবলিঙ্গ। তাই কোন নারী নিজেকে “ক্লীবলিঙ্গ” বলে বায়না ধরলে বা একই গাছে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল থাকে বলে কোন পুরুষ নিজেকে গাছের মতো “উভলিঙ্গ” ভাবলে এদের মাথায় গোলমাল আছে বুঝতে হবে। আমার তিন বছর বয়সের ভাইঝির “লিঙ্গ পরিচয়”বোধ নেই। সে তো অবোধ, বালখিল্য। এই “নব্যলিঙ্গ” চিন্তার দুটি ভাগ: “কাম” ও “লিঙ্গ” পরিচয়। একদল “লিঙ্গ চিন্তা”র সঙ্গে শয্যাসঙ্গের সম্পর্ক থাকার বিরোধী। আরেক দলের “কামচিন্তা” যৌনতার স্বাধীনতায় সোচ্চার! এসব নাকি নারী-পুরুষ সম্পর্কের “বিপ্লব”! মন-চিকিত্‍সকদের গবেষণার শেষ ফল DSM-5 বেরলো ১৮/৫/২০১৩-তে। সহমতে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাও ICD-10 নিয়ে। যাতে ওই ধরনের “কাম-লিঙ্গ” চিন্তা “Gender Identity Disorder”-”লিঙ্গ পরিচয়ে বিশৃংখলা” হিসেবে স্বীকৃত। অর্থাত্‍ জন্মকালীন লিঙ্গ পরিচয়ে অসন্তোষ ও লিঙ্গ পরিচয়কে অস্বীকার করা। এটা দু’ধরনের: রূপান্তরকাম, রূপান্তরলিঙ্গ। এতে আছে, সমকাম, উভলিঙ্গ, বিভেদহীন লিঙ্গ, ক্লীবলিঙ্গ, লিঙ্গহীন, বিপরীত লিঙ্গ, সুপ্তলিঙ্গ, রূপান্তর কাম, খণ্ডকাম, সর্বলিঙ্গ ইত্যাদি রকমারি “কাম” ও “লিঙ্গ পরিচয়” চিন্তা।

কিছু কারণ:
আত্মপরিচয়ে বা আত্মপ্রকাশে গোলমাল, বিচ্ছিন্নতা-একাকীত্ব, ব্যক্তিত্বের গোলমাল, আচরণগত সমস্যা, অসহ্য মানসিক চাপ, মনের স্বাভাবিক অবৃদ্ধি, ভীতি, আবেগে গোলমাল, অবদমিত কাম ইত্যাদি বিভিন্ন রকম মানসিক অসুস্থতা বা মস্তিষ্ক কোষের গঠনগত, জিনগত, হরমোনগত ত্রুটি বা বৈচিত্র, হাইপথ্যালামাস ও কিছু মস্তিষ্ক কোষের ক্রিয়াকর্মের ধরণবৈচিত্র অথবা রোগে ভুগে উক্ত শারীরিক-মানসিক অবস্থা ইত্যাদি থেকে “নব্যলিঙ্গ” চিন্তা হতে পারে।
এরসঙ্গে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের পারিবারিক, শিক্ষালয়, কর্মস্থল, প্রতিবেশের আবহ, বইপত্র, চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপন, টিভি, পর্ণোচিত্র, বিকৃত যৌন চিন্তা চর্চা ও প্রচার, ভোগবাদের হাতছানি, ভাববাদের পাগলামী, ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের চিন্তাজঞ্জাল, বিভিন্ন “অধিকার বোধ” নিয়ে বিকৃত চিন্তা ইত্যাদি অপসংস্কৃতির লাগাতার প্রচার-অপপ্রচার ব্যক্তিমনে প্রভাব ফেলছে। তৈরি হচ্ছে “নব্যলিঙ্গ” চিন্তা, অজাচার।

মনোবিদদের মতে কিছু লক্ষণ:
“লিঙ্গ পরিচয়ে বিশৃংখলা”য় অপ্রাপ্তবয়স্করা নিজের লিঙ্গ সম্বন্ধে বিরাগী, সামাজিক ক্ষেত্রে দৃষ্টির অগোচরে থাকে। উদ্বেগ, একাকীত্ব, ডিপ্রেসনে ভোগে। প্রাপ্তবয়স্করা আত্মহত্যাপ্রবণ হয়। এরা উদ্বেগপ্রবণতা, ডিপ্রেসন ইত্যাদিতে ভোগে। কেউবা যৌনমিলনে বিরাগী হয়, বিশেষত বিপরীত লিঙ্গের প্রতি। নারী হলে সিগারেট হবে অত্যধিক পছন্দের। মদ ও মাদক অপব্যবহার করবে। এই “নব্যলিঙ্গ”র পক্ষে তাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে পথে নেমেছে অনেকে। আছে নাস্তিক, আস্তিক, ‘ফাণ্ডেড-এনজিও’বাদী, সবজান্তা-বিজ্ঞ, বিদ্রোহী, প্রগতিশীল ইত্যাদি বহু ধরণ ও পেশার মানুষ। শিক্ষিতের সংখ্যা বেশি। “হুজুকে হুজুর” বলা কতক অর্ধশিক্ষিত আত্মপরিচয়ে মানবিক-মুক্তচিন্তা-মুক্তমন-প্রগতিশীল-রামধনু তকমা সেঁটে শামিল এখানে। এদের মুখ ঢাকা মুখোশে। কাজ “বিশৃংখলাকে প্রোমোট” করা। এরা বিপজ্জনক। আসলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিতের মুখে আনপড়দের মতো কথা শুনে বিভ্রান্ত হয় অনেকে। মিথ্যাকে সত্য বলে ধরে নেয়। ভেজালশীলকে প্রগতিশীল ভাবে। বিপদ বেশি এখানেই। এদের থেকে সতর্ক থাকা জরুরি। একসময়ে সারা ভারতকে “বেশ্যাপাড়া” বানাতে চেয়েছিল ভারতের কিছু “কুলাঙ্গার সন্তান”। বেশ্যারা নাকি শ্রমিক! ভোগবাদী বিশ্বের পুতুল খেলার পুতুল হয়ে নেচেকুঁদে স্বদেশের মা-মেয়ে-বোনদের বিক্রির চক্রান্ত করেছিল তারা। ভাবা যায়! এক অর্থনীতিবিদ তাঁর অর্থনীতিটাই পালটে ফেলছিলেন “বেশ্যার অর্থনীতি” নামে। একটা মিছিলও করলেন! যে-বৃত্তিটাকে সমূলে উচ্ছেদ করে বেশ্যাদের পুনর্বাসন দেওয়ার কথা; তাদের প্রতি মানবিক হয়ে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে সুস্থ সভ্য পেশায় নিয়োগ করার কথা। সেটা না করে তারা নামল “যৌনকর্মী-যৌনশ্রমিক” ইত্যাদি তকমা সাঁটতে। এইসব ধান্দাবাজ ফাণ্ডেড এনজিও, সেবা বিক্রির দালালদের মুখ আর মুখোশ চিনে নেওয়া দরকার। যুক্তির কাছে তাদের চেষ্টা জলে গেছে। এদেরই একটা অংশ সাধারণের মগজধোলাইতে নেমেছে নব্যলিঙ্গের পক্ষ নিয়ে। গুজব ছড়াচ্ছে এটা নাকি প্রাকৃতিক, স্বাভাবিক! বোঝাচ্ছে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র, মানবাধিকার, রুচিবোধ, প্রেম, সম্পর্কের Comfort, সম্পর্কের স্বাধীনতা, যৌনস্বাধীনতা ইত্যাদি শব্দের আড়ালে হাস্যকর অপসংস্কৃতি। এরা সভ্যতার ক্ষেত্রে ভয়ংকর বিপদ। এদের কথায় ভুলে কেউ হয়তো কুকুরের সঙ্গে  ”সহবাসের স্বাধীনতা” দাবি করবে! কিম্বা কোনো মেয়ে বিয়ে করতে চাইবে ষাঁড়ের সঙ্গে “COMFORT” ফিল করবে বলে! মানবাধিকারের দাবিতে মত্‍স্যকন্যা হয়ে পুরুষ-তিমির “প্রেমসঙ্গ” চাইবে কেউবা! পশুদেরকে মানবিক করতে পশু-মানুষে “সাম্য” দাবি করবে হয়তো কেউ! এ এক বিশৃংখলার গণউন্মাদনা! ভাবা যায়!
তাই নব্যলিঙ্গের পক্ষে প্রচারকদের আগুন ঝরানো বা দয়ার্দ্র কথায়, অপযুক্তির জালে ভুললে চলবে না। বিজ্ঞানের কিছু “পরিভাষা” নিয়ে বালখিল্যতায় মোহিত হলে বড় ভুল হবে। বরং জানতে হবে নব্যলিঙ্গের রূপ। তারা আসলে কে। কবে কে কোথায় নব্যলিঙ্গকে স্বীকৃতি দিয়েছে সেটাই “সত্য” নির্ধারক হবে কেন? কোন যুক্তিতে হবে? কোনো উন্নত দেশ যদি শোষক হয়, তবে ভারত বা অন্য অনুন্নত দেশও শোষক হবে নাকি? নিজেদের বিচারবোধ কি বন্ধক দেওয়া থাকবে উন্নত দেশের পদতলে? চিন্তায় শৈশব খেলা করবে নাকি? আর, কতদিন দালালদের তল্পিবাহক থাকবে ভারত? অনেক সময় তো গেল বৃথা সময় বিচার করে।

১২২ কোটির ভারতের ৮০% দরিদ্র থেকে হত দরিদ্র পরিবারে “নব্যলিঙ্গ বিশৃংখল চিন্তা” প্রায় থাকে না বলেই জানা গেছে। দেখছি শিক্ষিত ও স্বল্প শিক্ষিতদের ভিতর নব্যলিঙ্গ প্রবণতা; তাও শহুরে মানসিকতায়। সমকামীরা এখানে বেশি। বাস্তবে সমকামীদের সিংহভাগই বিপরীতকামীও। এদের একটা বড় অংশই ভণ্ড-ধান্দাবাজ সমকামী। এরা আলাদা স্বীকৃতির আছিলায় করেকম্মে খেতে চায়। পুরুষ সমকামীদের পায়ু-মৈথুনটা Comfort অনুভূতি। একইসঙ্গে যোনি-মৈথুনও চালায়। এরপরই এরা আত্মপরিচয় দেয় “উভলিঙ্গ” বলে। এরা সেয়ানা, ঘৃণ্য মানুষ। শিক্ষিত থেকে আনপড় সব আছে এখানে। এদেরই কেউ যদি সফল চিত্র পরিচালক হন বা শিক্ষক হন, তবে তাঁদের অনুগামীরা এঁদের ভালো কাজগুলোর সঙ্গে অপকর্মগুলোও গ্রহণ করে ফেলতে পারে, ফেলছেও দেখছি। মানব বিকাশে এটা ভয়ংকর।
আবার, হিজড়াদের (মেয়েলি পুরুষ) অনেকেই ওই সমকামী দঙ্গলে ঢুকেছে। লিঙ্গ কেটে প্রাচীনকালের “খোজা”দের মতো হয়। এদের পেশা তোলাবাজি, বেশ্যাবৃত্তি, পাচার, চোরা কারবার, অন্ধকার জগতের কাজকর্ম। অধুনা ‘BAR DANCE’, রকমারি ‘এন্টারটেইনমেন্ট’ ইত্যাদিতেও এরা ঢুকেছে। কোনো সুস্থ সভ্য পেশায় এরা থাকেনা। এরাও সেয়ানার দলে। এদের বেশিরভাগই আনপড়। ক্ষুদ্র দলটি মানসিক বিকৃতি নিয়ে বেঁচে আছে। মানসিক প্রতিবন্ধী। কেউবা শারীরিক প্রতিবন্ধী। এদের বড় অংশটি শিক্ষিত। বেশভূষায় আধুনিক। সিংহভাগের অপপ্রচারের পাল্লায় পড়ে এরা প্রতিবন্ধীই হয়ে রয়েছে। অজাচারেরও শিকার হচ্ছে। পাভলভিয় মনোবিদ্যার দ্বারা “নব্যলিঙ্গ”দের সুস্থ করা হয়েছে, হচ্ছে। শারীরবিজ্ঞানের দ্বারা এদের মস্তিষ্ক ও গ্রন্থির বিকৃতি ঠিক করা হচ্ছে। গত ৩০ বছরের অভিজ্ঞতায় এই তথ্য জানাচ্ছে বিশ্বের প্রায় ২ লক্ষ মনোবিদ।
এদিকে ভারতে অভিযোগ, কিছু মিডিয়া, সবজান্তা শিক্ষিতরা “মন বিশৃংখলার গণউন্মাদনা” ছড়াচ্ছে। বিজ্ঞানের নামে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। পেছনে আছে ফাণ্ডেড এনজিও। “হুজুকে হুজুর”রা এখানে লেজুড়। কোটি ডলার বিলি হচ্ছে “নব্যলিঙ্গ”দের গালে, দেহে রং মাখিয়ে সর্বসমক্ষে হাস্যস্পদ করতে! কেউবা উদাসিন, চুপ। ভাবা যায়! এটা এখন মনোবিদদের ভাবাচ্ছে। মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার, নারীবাদী, নাস্তিক, পরিবেশ রক্ষা, মানবতাবাদী ইত্যাদি অধিকার আন্দোলনের সত্‍ কর্মীদেরকে ভাবিয়ে তুলেছে। সাধারণ গরিব-গুর্বো মানুষও শিক্ষিতদের রকম দেখে হাসছে!
এই মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের নিয়ে ছেলেখেলা করা, আলাদা ছাপ মেরে হাসির খোরাক করা, “মানবতা”র তকমা সেঁটে দেওয়াটা হল “মানবতারই” বিরোধীতা করা; “অমানবিকতা”কে প্রশ্রয় দেওয়া। সুস্থ সমাজ বিকাশে যা প্রতিবন্ধক। বরং চিকিত্‍সায় ওদের সুস্থ করে তোলাটাই মানবিক। আর, সেয়ানা “নব্যলিঙ্গ”দের  গুছিয়ে মানবিক “ট্রিটমেন্ট” দিলে তারা ঠিক হয়ে যাবে। আইন এদিক থেকে কার্যকর ভৃমিকা নিতে পারে। এর সঙ্গে যুক্তিবাদী প্রতিবেশ গড়ে তোলাটা জরুরি। নাস্তিক্য কোন দর্শন নয়। তাই সমস্যাটি সমাধানের একমাত্র সাংস্কৃতিক-দার্শনিক পথ হল যুক্তিবাদী পরিবেশ গড়া। মানবতাবাদী চিন্তা, যুক্তিবাদী চিন্তা চর্চাই পারে এই প্রতিবেশ গড়তে। মানুষের ভাবনা “দানবের”(!) মতো হয়ে যাওয়াটা মানবিক নয়; “দানবিক”! “না-মানুষে”র মতো হলে সেটা “মানবিক” নয়; সেটা “না-মানবিক”!
মানুষ হয়ে মানুষের মতো ভাবা দরকার। বঞ্চিতের সহমর্মী, সহযোগি হওয়া জরুরি। নারী-পুরুষে সুস্থ প্রেম ও যৌনজীবন শ্রেয়। মানুষের প্রতি মানবিক আচরণ
কাম্য। নচেত্‍ সুস্থ মানবসমাজ বিকাশ হবে অধরা। অতএব,
“সকলেই প্রতিদিন
মনের যত্ন নিন।”

Share

Leave a Reply

 

 

 

You can use these HTML tags

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>