দুটো সাম্প্রতিক বাংলা চলচ্চিত্র

—-সুমিত্রা পদ্মনাভন

ইতি মৃনালিণী দেখব বলে দিন গুনছিলাম। অনেক দিন আগে থেকেই বিজ্ঞাপন, টি ভি তে হাইপ, মাঝে মাঝেই মা-মেয়ে- অপর্ণা-কঙ্কণার সাক্ষাতকার। উতসাহ ক্রমশ; তুঙ্গে। অপর্ণা সেনের কাজ, দেখতেই হয়। সবসময়েই একটু আলাদা। ঝকঝকে, বুদ্ধিদীপ্ত, কখনো বা একটু বেশি ঘ্টনাবহুল(পারমিতার একদিন), কিন্তু সবসময়েই সু-পরিচালনার ছাপ সুষ্পষ্ট। তাই একটু আশাভঙ্গ হল শেষমেশ। শুরুটা মানে প্রথমার্ধ খুব সুন্দর। অসাধারণ অভিনয় কঙ্কনার। চেহারাও ছিপছিপে, কলেজ-পড়ুয়ারই মত। কফি-হাউসে আড্ডা, কবিতা, নকশাল আন্দোলনে একটি মৃত্যু – সব সুন্দর ফ্ল্যাশব্যাকে। অপর্ণার সাজ, সফিস্টিকেটেড আচরণ- সবই বুঝিয়ে দেয় পরিবর্তন। আনকোরা কঙ্কনা থেকে ক্রমশঃ আত্মবিশ্বাসী অপর্ণা হয়ে ওঠা, সফল শিল্পী হয়ে ওঠা। নাঃ গল্পটা বলবনা। শুধু শেষ অবধি কেন মন ভরলো না, সেটাই বলছি।

একাকীত্ব। ক্রমশঃ একা হয়ে যাওয়া। নিঃস্ব হয়ে যাওয়া। এক সফল, সুন্দরী শিল্পীর ক্রমশঃ প্রৌঢ়ত্বের দিকে গড়িয়ে যাওয়া—সবই স্বাভাবিক। কিন্তু একটা প্রশ্ন— সত্যি একা হয়ে যেতে হলে কি অনেক দুর্ঘটনা, মৃত্যু, অপঘাত—এসবের দরকার হয়? একজন শিল্পীর একাধিক সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়া, হতাশা—এগুলোই কি যথেষ্ট নয়? পরের অর্ধেকে দু-দুটো মৃত্যু এতটাই অপ্রয়োজনীয় মনে হয়, যে চোখে জলও আসেনা। শুধু মনকে ছুঁয়ে যায় একটাই দৃশ্য – বন্ধু চিন্তনের না দেখা পঙ্গু স্ত্রী যখন প্রথম দর্শনে দু-হাত বাড়িয়ে দেয় মৃনালিনীর দিকে। শান্ত, সুশ্রী মুখে স্নেহ, প্রশ্রয়। এত সুন্দর দু-জন বন্ধু থাকতে আর মৃনালিনী একা নয় – এটা শেষ অঙ্কে গিয়ে বুঝতেও পারে সে। কিন্তু একেবারে শেষটা? একটা ধাক্কা, একটা শক। এতটাই শকিং যে মেলোড্রামা হয়ে যায়। দেখি থমথমে মুখে হলভর্তি মানুষ বেরোচ্ছে। ভাবলেশহীন মুখ। যেন এক্ষুনি একটা থাপ্পড় খেয়েছে; কেন খেয়েছে জানেনা।

সত্যি কথা – কাহিনীতেই কোথাও পরিমিতির অভাব।

আরেকটা উল্লেখযোগ্য বিষয় – অবাঙ্গালি কে দিয়ে ডাবিং করিয়ে বাঙ্গালি পরিচালকের ভূমিকায় রজত কাপুর । খুব ভাল অভিনয়, কিন্তু ওঁকেই কেন? আর চিন্তনের ভুমিকায় নিপাট বাঙ্গালি ভদ্রলোক কৌশিক সেন, দক্ষ অভিনেতা। কিন্তু সেদিকে নজর পড়ছিল না। কান খালি সজাগ হচ্ছিল দক্ষিণী ভূমিকায় বিকৃত বাংলা উচ্চারণের দিকে। কী দরকার ছিল? ভাবের চেয়ে উচ্চারণ নিয়ে বেশি বিব্রত হয়ে পড়ছিলাম। এরকম এক্সপেরিমেন্ট করেছেন অপর্ণা হয়ত ছবিকে সর্বভারতীয় একটা মাত্রা দিতে। ফল ভাল হয়নি।

অভিনয়ে সবাই ভাল। শুধু কমলাদি নামের চরিত্রটি মন ছোঁয়নি। টিকোলো নাক, সুন্দরী চেহারার কাজের মাসিটি তার ব্যবহারে, বলা-চলায় কোথাও নিম্নবিত্ত, স্নেহশীল, পুরোনো কাজের লোক হয়ে উঠতে পারেননি। অসম্ভব আড়ষ্ট অভিনয়। যথেষ্ট গুরত্বপূর্ণ ভূমিকায় এত কাঁচা শিল্পী কেন?

দেখতে ভাল লেগেছে মূলতঃ কঙ্কণার অভিনয়। অসাধারণ! মা-মেয়ের সাজ পোষাক যথারীতি অনবদ্য। গান, কবিতা, আবহ –সবই চোখ ফেরাতে দেয়না এক মুহূর্ত। কিন্তু শেষটা? … নাঃ

————-

ইচ্ছে দেখার ইচ্ছে প্রথমে হয়নি। কারণ তেমন করে বিঞ্জাপিত হয়নি ছবিটা। হঠাত দেখি পোস্টারে সোহিনীর মুখ। সোহিনী (হালদার) সেনগুপ্ত। তা হলে তো দেখতেই হয়। সত্যি, সোহিনীই টেনে নিয়ে গেছেন গোটা সিনেমাটাকে। মূলত মা-ছেলেকে ঘিরে গল্প। মা-ই মুখ্য ভূমিকায়। কোথাও মনে হয়নি অভিনয়। যেমন পারমিতার একদিন- এ সোহিনী কে দেখে একবারও মনে হয়নি ও একজন স্বাভাবিক মেয়ে। এইরকম একটা ভূমিকা- মধ্যবিত্ত, নর্থ ক্যালকাটা-র সাধারণ বাড়ির বউ, এক ছেলের মা। অসাধারণ অভিনয়। ক্রমশঃ বয়স বাড়া, ক্লান্তি, একটু পাগলামির লক্ষণ। এই অভিনয় প্রাইজ না পেলে অবাক হব।

বাকি সবই সাধারণ। অল্প বাজেটের ছবি। কোথাও কোথাও আর্টিফিশিয়াল সেট চোখে লাগছে। ছেলেটির চেহারা সাধারণ, অভিনয় শেষদিকে বেশ ভাল।

এই ছবির মূল ব্যাপারটা হচ্ছে এর থীম বা বিষয়বস্তু। এতই গুরুত্বপুর্ণ, যে এটা একটা দরকারী ছবি হয়ে উঠেছে; সকলেরই দেখা উচিত। বাবা-মা দের তো বটেই। কেন এই বিষয় নিয়ে কেউ আগে ছবি করেননি জানিনা। বোধহয় ছেলে মানুষ করা নিয়ে একটা সফল ছবি হতে পারে, ভাবেনি কেউ। সোহিনী কে না পেলে করা ঠিক হতও না বোধহয়। কারণ ঠিক ওইরকম অবসেস্‌ড মায়ের ভূমিকায় অন্য কেউ? ভাবাই যায়না। টিভি সিরিয়ালের ন্যাকা মেলোড্রামা হয়ে যেত।

অবশ্যই দেখুন।

Share

Leave a Reply

 

 

 

You can use these HTML tags

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>