অসত্য খবরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ

মাননীয় সম্পাদক,
একদিন
কলকাতা
পত্রপাঠ

বিষয়ঃ অসত্য খবরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ

মহাশয়,
গত ৩০/৫/২০১২ তারিখে আপনার পত্রিকার দুর্গাপুর এডিশনের ৪র্থ পাতায় ‘‘তৃণমূল নেতার তৎপরতায় ডাইনি অপবাদ থেকে রক্ষা’’-শিরোনামের দু কলামের খবরটি পড়ে যার পর নাই বিস্মিত হয়েছি। খবরে উল্লেখ, পুরুলিয়ার মানবাজার থানার কপড়রা গ্রামের লক্ষীমণি কিসকুকে গ্রামের কিছু মাতব্বর লোক ডাইনি সন্দেহে অপবাদ দিয়ে বিরাট অঙ্কের টাকা জরিমানা করে। হ্যাঁ, এই পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু লক্ষীমণির পরিবারকে বাঁচাতে এলাকার দুই তৃণমূল নেতা অবতীর্ণ হয়েছেন, এই খবরের সত্যতা একেবারেই নেই। যেহেতু এই ঘটনাটির সাথে যুক্তিবাদী সমিতির তরফ থেকে আমরা আগাগোড়া যুক্ত ছিলাম, তাই পুরো ঘটনাটি সংক্ষিপ্ত ভাবে তুলে দিচ্ছি।
২৮ মে সন্ধ্যের দিকে যুক্তিবাদী সমিতির পুরুলিয়ার শাখা সম্পাদক মধুসূদন মাহাতোর কাছে সংবাদমাধ্যমের বিশ্বস্ত সূত্র থেকে খবর আসে যে, মানবাজার থানার কপড়রা গ্রামে এক মহিলাকে ডাইনি সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং রাতের দিকে একটি বিচার সভার আয়োজন করা হবে যেখানে ওই মহিলাকে বিরাট অঙ্কের টাকা জরিমানা করা হবে, অনাদায়ে মহিলাকে হত্যাও করা হতে পারে। ঘটনাচক্রে এই দিনগুলোতে বিবিসি চ্যানেলের ভারতীয় প্রতিনিধিরা যুক্তিবাদী সমিতির কুসংস্কার দূরীকরণের ওপর একটি তথ্যচিত্র নির্মানে হাত দিয়েছিলেন এবং ওই ২৮ মে তারিখটিতে তারা পুরুলিয়াতেই ছিলেন। বিবিসির এই টিমের প্রধান সাংবাদিক ছিলেন কল্পনা প্রধান। হাতে সময় অল্প, মহিলার প্রাণ বাঁচাতে হবে, তাই বিবিসির গাড়িতেই মধুসূদন মাহাত তার সঙ্গীদের নিয়ে কপড়রার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তারা গ্রামে পৌছন রাত ১১ টা নাগাদ। গ্রামে তখন উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। এদিকে সন্ধ্যে থেকেই যুক্তিবাদী সমিতির আর একটি দল ঐ মহিলাকে বাঁচাতে প্রশাসনিক স্তরে কড়া নাড়তে শুরু করে। রাত ৮ টা নাগাদ কাশিপুর থানার সার্কেল ইন্সপেক্টর এবং মানবাজার থানার ওসিকে হিউম্যানিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের জেলা গনমাধ্যম সম্পাদক মনীশ কুমার বিষয়টি সম্বন্ধে প্রথম অবহিত করেন। এই হিউম্যানিস্টস অ্যাসোসিয়েশন হল যুক্তিবাদী সমিতিরই সিস্টার কর্ণসান। হিউম্যানিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের পুরুলিয়া জেলা সভাপতি অজয় সিং রাত ৮ টা ২০ তে জেলার পুলিশ সুপার সি সুধাকর কে বিষয়টি জানান। পুলিশ সুপার সমস্ত রকম সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন। রাত ৯টা নাগাদ সমিতির তরফে রাজ্যের শিক্ষা মন্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করা হয়।
ওদিকে যুক্তিবাদী সমিতি এবং বিবিসির দলটি প্রচন্ড বিপদের ঝুঁকি নিয়েই রাত এগারোটা থেকে ভোর পর্যন্ত কপড়রা গ্রাম এবং মানবাজার থানাতে নানা ঝামেলার মধ্যে কাটায়। তারা পরদিন অর্থাৎ ২৯ মে সকাল ১১ টা নাগাদ পুলিশ সুপারের সাথে দেখা করে লক্ষীমণি কিসকুর নিরাপত্তার বিষয়টি উত্থাপন করে, তারই ফলস্বরূপ ওই দিন বিকেল ৪ টে নাগাদ মানবাজার থানার পুলিশ যুক্তিবাদী সমিতি এবং বিবিসির উপস্থিতিতে লক্ষীমণি কিসকুর পরিবারকে বোরো থানার ঝগড়ুডিহ গ্রামে আত্মীয় বাড়িতে সাময়িক ভাবে স্থানান্তরিত করে। সেদিনই সন্ধ্যে ৬ টাতে ডাইনি অপবাদটি মীমাংসা করতে যুক্তিবাদী সমিতি ফের কপড়রা গ্রামে যায়। এই দুদিনের ঘটনাটিই পরদিন বিভিন্ন সংবাদপত্রে গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হয়।
এবার জানাই, এই পুরো ঘটনাটিতে স্থানীয় কোনো রাজনৈতিক নেতার সাহায্য পাওয়া যায়নি। সত্যি বলতে কি আদিবাসীদের ডাইনিপ্রথা দূর করতে কোনো দিনই সিপিএম, কংগ্রেস, তৃ্নমূল কংগ্রেস কোনো দলেরই দেখা মেলে না। বরং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতারা হয় নিজেরাও এই কুকর্মে জড়িত থাকেন অথবা আদিবাসী সেন্টিমেন্টে ঘা পড়ার ভয়ে নিজেদের ভোটবাক্সের কথা ভেবে চুপ থাকেন। দীর্ঘ বছরের ডাইনিপ্রথা বিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস আমাদের এই সাক্ষ্যই দেয়। গত ৩৪ বছরেও যা ছিল, সমস্যাটি আজও তাই আছে।
পরিশেষে একটি নোট রইলো। আপনাদের সংবাদ সংগ্রাহকদের অনুরোধ, সস্তার সাংবাদিকতা নয়, জনগনের সামনে প্রকৃ্ত ঘটনাগুলি তুলে ধরার চেষ্টা করুন। আর যে সমস্ত রাজনৈতিক নেতারা ঝামেলা টামেলা মিটে যাবার পর গুড় খাবার লোভে সাংবাদিকদের বাইট দেন তাদের বয়কট করুন। এই কেসটিতে সংবাদপত্রে বাইট দেওয়া নেতাদের আমরা অনুরোধ করছি, যদি আপনাদের সত্যি সত্যিই কুসংস্কার দূরীকরনের বিন্দুমাত্রও ইচ্ছে থাকে তাহলে আপনারা প্রশাসনকে চাপ দিয়ে ডাইনি সাব্যস্তকারী ওঝা বা জানগুরুটিকে শাস্তিদানের ব্যবস্থা করুন। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আর প্রশাসনের তরফ থেকে যদি এইটুকু সাহায্য পাওয়া যায়, তাহলে ডাইনিপ্রথা বিরোধী আন্দোলনে নতূন সূর্য উঠতে বেশিদিন লাগবেনা। আশা করি ‘একদিন’ এর মত প্রথম সারির প্রগতিশীল পত্রিকাও কুসংস্কার দূরীকরনে সকলের সাথে হাত মিলিয়ে কাজ করবে।

(বিপ্লব দাস)
সাধারণ সম্পাদক
ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি
৭২/৮ দেবীনিবাস রোড, কলকাতা-৭৪

Share

Leave a Reply

 

 

 

You can use these HTML tags

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>